শেখ মুহাম্মাদ নাজিম 

আল্লাহ তার রহস্যকে পবিত্র রাখুন

 

তোমরা যারা তীর্থে গেছ

–তোমরা কোথায়? কোথায় ? কই?

এখানে প্রিয়তম, এইখানে

–এস, এস, এস হে এস

বন্ধু তোমার, সেতো প্রতিবেশী,

তোমার বাড়ির পাশে, পাশেই সে–

তুমি মরুর পথে মরছ ঘুরে

হায় ভালোবাসার এ কোন রীতি?

                                    –রুমি, দিওয়ান

 

তিনি একনিষ্ঠ জনের নেতা, বিলায়াতের রহস্য, যিনি নকশবন্দি ধারাকে বিংশ শতাব্দির শেষের দিকে আল্লাহ সুবহানু ওয়া তা’আলার বিধান ও সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদ প্রদর্শিত নৈতিকতার সঙ্গে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। যাতনা, ক্ষোভ, ত্রাসের আগুন ও ধোঁয়ার অন্ধকারে আচ্ছন্ন জাতি ও ধরাকে সিক্ত করলেন তিনি আল্লাহর প্রেমে আর তাদের প্রতি প্রেমে যারা আল্লাহর প্রেমিক।

তিনি গোপন রহস্য উন্মোচনকারী, আলোর রক্ষক, শেখদের শেখ, তপস্বীর সুলতান, মুত্তাকীদের সুলতান, সত্যের লোকদের সুলতান। তিনি বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ঐশী জ্ঞানের অদ্বিতীয় প্রধান পুরুষ। তিনি এই সুফি ধারার জ্ঞান মহাসাগর থেকে বৃষ্টি, যা এই বিশ্বের সমস্ত অঞ্চলে প্রফুল্লতা জাগিয়ে তুলছে। তিনি সাত মহাদেশের সাধক, তাঁর আলো বিশ্বের সমস্ত মহল থেকে শিষ্য এবং শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করেছিল। তিনি ঐশী উপস্থিতির নূরের আলখাল্লাটি পরেন। তিনি তাঁর সময়ে অনন্য। তিনি ঐশ্বরিক প্রেমের পৃথিবীতে রোপণ করা অর্কিড। তিনি সমস্ত মহাবিশ্বের জন্য সূর্য। তিনি উভয়দিকের ওয়ালি হিসাবে পরিচিত: বাহ্যিক জ্ঞান এবং অভ্যন্তরীণ জ্ঞান।

তিনি আল্লাহর অলৌকিক ঘটনা, পৃথিবীতে হেঁটে বেড়াচ্ছেন এবং আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি আল্লাহর রহস্যের গোপনীয়তা, তাঁর ঐশ্বরিকতায় উপস্থিত এবং তাঁর অস্তিত্বে জায়মান। তিনি পথপ্রদর্শনের সিংহাসনের মালিক, ঐশী আইনের পুনরুজ্জীবনকারী, সুফিপথের নেতা, সত্যের নির্মাতা, বৃত্তের পথপ্রদর্শক, সমস্ত রহস্যের গীতিকবিতা। সন্তদের নেতা তিনি, নেতাদের সন্ত। সন্ধানকারীরা তাঁর আলোর কাবা প্রদক্ষিণ করে। অবিরত ধারায় বয়ে চলা ঝর্ণা তিনি, তরঙ্গময় অবিশ্রান্ত জলপ্রপাত তিনি অবিরল বানে ভাসিয়ে নেয়া নদী তিনি, চূড়া হওয়া আর অসংখ্য কুলে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের অসীম মহাসাগর তিনি।

তিনি জন্মেছিলেন সাইপ্রাসের লারনাকাতে ১৯২২ সালের ২৩ এপ্রিল, ১৩৪০ হিজরির ২৬ শে শা’বান। দিনটি ছিল রবিবার। তার পিতার বংশধারা পেছন দিকে কাদিরিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা সাইয়্যিদিনা আবদুল কাদির জিলানিতে ق গিয়ে পৌঁছায়, এবং অন্যদিকে তার মা ছিলেন মেভলেভি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সাইয়্যিদিনা জালালুদ্দিন রুমির ق বংশধর। তিনি তার পিতামহের দিক দিয়ে হাসানি ও হুসাইনি, নবি করিম এর বংশধর। বাবার দিক থেকে তিনি পেয়েছিলেন কাদিরি তরিকা এবং মায়ের দিক থেকে মেভলেভি তরিকা।

তার শৈশবে তিনি তার পিতামহের সঙ্গে বসে আধ্যাত্মিকতা ও শৃঙ্খলা শিখতেন। তাঁর দাদা কাদিরি তরিকার একজন শেখ ছিলেন। অনন্যসাধারণ সব লক্ষণ তখন তাঁর মধ্যে দেখা গিয়েছিল। তাঁর আচরণ ছিল নিখুঁত: তিনি কারুর সঙ্গে ঝগড়া বা তর্ক করতেন না, সবসময়ই হাশিখুশি আর ধৈর্য্যশীল ছিলেন। তারা দাদা আর নানা দুজনেই তাকে আধ্যাত্মিক পথের শিক্ষা দিয়েছিলেন।

তরুণ বয়সেই উঁচু আধ্যাত্মিক পর্যায়ের জন্য তাকে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হতো। লারনাকার সবাই তাকে চিনতেন, কম বয়সেই তিনি মানুষকে পরামর্শ দিতে পারতেন, ভবিষ্যৎ জানতে পারতেন এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা বলে দিতেন। পাঁচ বছর বয়সেই তার মা তাকে মাঝেমধ্যে খুঁজে পেতেন না। খোঁজাখুজির পর তাকে পাওয়া যেত হয় মসজিদে অথবা নবি করিম এর নারী সাহাবি উম্মুল হিরাম (রা.) এর কবরে, যার পাশে একটি মসজিদ ছিল। নারী সাহাবি উম্মুল হিরাম (রা.) এর কবরে প্রচুর সংখ্যক ট্যুরিস্ট ভ্রমণে আসত, বিশেষ করে তার কবরের উপরে একটি শূন্যে ভাসমান পাথর ছিল। সেটা দেখাই মূল আকর্ষণ ছিল। যখন তাঁর মা সেখানে এসে তাকে বাসায় নিয়ে যেতে চাইতেন তিনি বলতেন, “আমি এখানে উম্মুল হিরামের (রা.) সঙ্গে থাকব, তিনি আমাদের পূর্বসুরী।” তাঁকে কখনও কখনও দেখা যেত উম্মুল হিরামের (রা.) সঙ্গে কথা বলছেন, অথচ যিনি চৌদ্দশত বছর আগেই মারা গিয়েছেন! তিনি কথা বলছেন, শুনছেন, জবাব দিচ্ছেন যেন তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতা চলছে। যখনই কেউ তাকে বিরক্ত করত তিনি বলতেন, ‘চলে যাও, আমি এই কবরে থাকা আমার দাদির সঙ্গে কথা বলছি।’

তার বাবা তাকে সে সময়কার সেকুলার জ্ঞানার্জনের জন্য স্কুলে পাঠিয়েছিলেন, সণ্ধ্যাবেলায় শিখতেন ধর্মীয় জ্ঞানের বিষয়াদি। তিনি তার সহপাঠীদের মধ্যে অধিকতর মেধাবী ছিলেন। রাতে স্কুলের পড়া শেষ করে তিনি মেভলেভি ও কাদিরি তরিকার চর্চা করতেন। বৃহস্পতি ও শুক্রবার কাদিরি ও মেভলেভি সার্কেলের নেতৃত্ব দিতেন।

সাইপ্রাসের সকলেই তাঁকে প্রচণ্ডরকমের আধ্যাত্মিক ব্যক্তি হিসাবে চিনত। তিনি শরিয়াহ, আইনশাস্ত্র, হাদিসশাস্ত্র, যুক্তিবিজ্ঞান, কোরআনের তাফসির বা ব্যাখ্যা শিখেছিলেন এবং তিনি ইসলামিক বিষয়গুলির পুরো পরিসীমা সম্পর্কে ফিকহি রায় দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি সমস্ত আধ্যাত্মিক স্তর থেকে কথা বলতে সক্ষম হন। পরিষ্কার বাস্তব ও সহজ-পরিশ্রমে জটিল বাস্তবতার ব্যাখ্যা দেওয়ার মেধা তাঁর ছিল।  

সাইপ্রাসে হাই স্কুল শেষ করার পরে, ১৩৫৯ হিজরি / ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইস্তাম্বুল চলে গেলেন, যেখানে তাঁর দুই ভাই এবং এক বোন থাকতেন ও লেখাপড়া করতেন। তিনি বায়েজিট জেলার ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে রাসায়নিক প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। একই সাথে তাঁর শেখের কাছে তিনি তাঁর শরিয়াহ জ্ঞান এবং আরবি ভাষা অধ্যয়নের ক্ষেত্রে অগ্রণী হয়েছিলেন। তার শেখ ছিলেন শেখ জামালউদ্দীন আল-আলাসুনি, যিনি ১৩৭৫ হি. / ১৯৫৫ খ্রি. সালে মারা গিয়েছিলেন। তিনি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন এবং তিনি তার সহপাঠীদের মধ্যে সেরা হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা তাকে গবেষণায় যেতে উৎসহিত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমি আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতি কোন আকর্ষণ অনুভব করি না। আমার মন সবসময় আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়।”

“রসুল আমাকে ডাকছেন। আমার অন্তরের ভেতর সবকিছু ছেড়ে নবি ﷺ এর পবিত্র নগরে হিজরত করার গভীর ব্যকুলতা ছিল।”

একদিন, যখন আমার মনের মধ্যে এই আকুতি বিশেষভাবে প্রবল ছিল, আমি এমন একটি ভিশন/দিব্যদর্শন দেখলাম যাতে আমার শেখ সুলায়মান আরজারুমি এসে কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে আমাকে বললেন, ‘এখন অনুমতি এসেছে। তোমার গোপনীয়তা এবং তোমার আস্থা (ট্রাস্ট) এবং আধ্যাত্মিক হিদায়াত আমার সঙ্গে নেই। আমি কেবল তখনই তোমাকে আস্থা হিসাবে ধরেছিলাম যতক্ষণ না তুমি তোমার আসল শেখ, যিনি আমারও শেখ, শেখ আবদুল্লাহ আদ্ দাগেস্তানির জন্য প্রস্তুত হও। তিনি তোমার চাবি ধরে রেখেছেন। তাই শামে তাঁর কাছে যাও। এই অনুমতি আমার কাছ থেকে এবং রসুলুল্লাহ () এর কাছ থেকে এসেছে।’ [শেখ সুলায়মান আরজুরমি নকশবন্দি তরিকার ৩১৩ জন আউলিয়ার মধ্যে একজন ছিলেন, যারা ৩১৩ জন রসুলের কদমের নীচে দাঁড়িয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন।]

“এই দিব্যদর্শন শেষ হয়েছিল এবং এর সাথেই আমি শামে যাওয়ার অনুমতি পেলাম। আমি আমার শেখকে সেই দিব্যদৃষ্টি সম্পর্কে জানাতে চেয়েছিলাম। আমি প্রায় দুই ঘন্টা পরে তাকে মসজিদে আসতে দেখলাম। আমি ছুটে গেলাম তার কাছে। তিনি বাহু খুলে আমাকে বললেন, ‘আমার পুত্র, তুমি কি তোমার ভিশনে খুশি?’ তখন আমি জানলাম যে, যা ঘটেছিল তা তিনি জানতেন। তিনি বলেছিলেন, ‘অপেক্ষা করো না। নিজেকে শামের অভিমুখী কর। তিনি শামের শেখ আবদুল্লাহ আদ্ দাগেস্তানি নাম বাদে আমাকে কোনও ঠিকানা বা অন্য কোনও তথ্যও দেন নি। আমি ইস্তাম্বুল থেকে ট্রেনে করে আলেপ্পো ভ্রমণ করলাম, যেখানে আমি কিছু সময় ছিলাম। সেখানে থাকাকালীন আমি এক থেকে অন্য মসজিদে যেতাম, নামাজ পড়তাম, আলেমদের সাথে বসে ইবাদত ও ধ্যানে সময় কাটাতাম।

“তারপরে আমি হামে ভ্রমণ করেছি, যা আলেপ্পোর মতো একটি খুব প্রাচীন শহর। আমি শামের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলাম, তবে এটা অসম্ভব ছিল। ফরাসিরা, যারা শামকে দখল করেছিল, ইংরেজদের আক্রমণ ঠেকানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাই আমি হোমসে নবিজি ﷺ এর সাহাবি সাইয়্যিদিনা খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) এর কবরে ভ্রমণ করলাম। আমি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) এর যিয়ারাত করি এবং তারপরে আমি মসজিদে ঢুকলাম এবং নামাজ পড়লাম। একজন পরিচারক আমার কাছে এসে বললেন, ‘আমি গত রাতে একটি স্বপ্ন দেখেছি যাতে নবি আমার কাছে এসেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার এক নাতি আগামীকাল এখানে আসছেন। আমার জন্য তাঁর যত্ন নিও।’ তারপরে তিনি আমাকে দেখালেন আপনি কেমন দেখতে হবেন। এখন দেখছি আপনেই সেই ব্যক্তি।’”

“তিনি যা বলেছিলেন তাতে আমি এতটাই বিস্মিত হয়েছিলাম যে আমি তার আমন্ত্রণটি মেনে নিয়েছিলাম। তিনি আমাকে সেই মসজিদের নিকটে একটি কক্ষ দিলেন, সেখানে আমি এক বছর থাকি। আমি প্রার্থনা করা এবং হোমসের দুজন বিশিষ্ট আলেমের মজলিসে বসার বাইরে  কখনও বের হই নি, তারা তেলাওয়াত (তাজবিদ), তাফসির, ‘ইলম আল-হাদিস এবং ফিকহ শিক্ষা দিতেন । তারা হলেন শেখ মুহাম্মদ ’আলি ’উয়ুন আস-সুদ এবং শেখ আবদুল আজিজ ’উয়ুন আস-সুদ; তারা হোমসের মুফতি ছিলেন। আমি দুজন নকশবন্দি শেখের আধ্যাত্মিক শিক্ষার ক্লাসে অংশ নিয়েছি শেখ আবুল জলিল মুরাদ এবং শেখ সা’ইদ আস সুবাই। আমার হৃদয় শামের দিকে যেতে আকুল ছিল। যুদ্ধটি তীব্র হওয়ার কারণে, আমি নিরাপদ উপায়ে লেবাননের ত্রিপোলি, সেখান থেকে বৈরুত এবং বৈরুত থেকে শামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।”

১৩৬৪ হিজরি, ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে শেখ নাজিম বাসে করে লেবাননের ত্রিপোলিতে চলে যান। বাস তাঁকে বন্দরে নামিয়ে দেয়। তিনি সেখানে অপরিচিত ছিলেন, কাউকে চিনতেন না। তিনি বন্দর এলাকা ঘুরে বেড়াতে গিয়ে দেখলেন, রাস্তার বিপরীত দিক থেকে কেউ আসছেন। সেই ব্যক্তি হলেন শেখ মুনির আল-মালেক, ত্রিপোলির মুফতি। তিনি একই সাথে শহরের সমস্ত সুফি ধারারই শেখ ছিলেন। তিনি কাছে এসে বললেন, আপনি কি শেখ নাজিম? আমি এক স্বপ্ন দেখলাম নবি করিম আমাকে বলছেন, ‘আমার এক নাতি ত্রিপলিতে আসছেন।’ তিনি আমাকে আপনার অবয়ব দেখিয়েছিলেন এবং আমাকে বলেছিলেন যে এই অঞ্চলে আপনাকে খুঁজতে হবে। তিনি আমাকে আপনার যত্ন নিতে বলেছেন।”

শেখ নাজিম বলেছেন:

“আমি শেখ মুনির আল-মালেকের সঙ্গে একমাস থাকলাম। তারপরে তিনি আমার জন্য হোমসে এবং হোমস থেকে দামেস্কে যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। আমি হিজরি ১৩৬৫ সালের শুরুতে খ্রিস্টীয় ১৯৪৫ সালের এক শুক্রবার দামেস্কে পৌঁছাই। আমি জানতাম যে সাইয়্যিদিনা বিলাল আল-হাবশি (রা.) এর সমাধির নিকটবর্তী হাই্ আল-মায়দান জেলায় শেখ আবদুল্লাহ ق বাস করেন। সেখানে নবি পরিবারের অনেক বংশধর ছিলেন, প্রাচীন কাল থেকে স্মৃতিসৌধে পূর্ণ একটি অঞ্চল।”

“আমি জানতাম না মাওলানা শেখের বাড়ি কোনটি ছিল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সেই মুহূর্তে আমার কাছে একটি অধ্যাত্ম-দর্শন এসেছিল, তাতে দেখতে পেলাম শেখ আব্দুল্লাহ ق তার বাসা থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে ভিতরে ডাকছেন। এই অন্তর্দশন শেষ হলো কিন্তু আমি রাস্তায় কাউকে দেখতে পেলাম না। ফরাসি এবং ইংরেজদের বোমাবর্ষণের কারণে রাস্তা ফাঁকা ছিল। সবাই ভয় পেয়ে নিজের ঘরে লুকিয়ে ছিল। রাস্তায় আমি একা ছিলাম। তাঁর বাড়িটি কেমন তা জানার জন্য আমি মনে মনে ধ্যান করছিলাম। তারপরে একটি দর্শনে আমি একটি নির্দিষ্ট দরজা সহ একটি নির্দিষ্ট ঘর দেখতে পেলাম। দরজাটি না পাওয়া পর্যন্ত আমি তাকিয়ে রইলাম। আমি দরজায় নক করার জন্য কাছে আসতেই শেখ দরজাটি খুললেন। তিনি বলেছিলেন, ‘স্বাগতম, আমার ছেলে, নাজিম এফেন্দি।’

“তাঁর অস্বাভাবিক চেহারা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে আকৃষ্ট করল। এর আগে কখনও কোনও শেখকে এমন দেখি নি। তার মুখ এবং কপাল থেকে আলো ঠিকরে বেরুচ্ছিল। তার হৃদয় আর মুখের উজ্জ্বল হাসি থেকে থেকে আসা উষ্ণতা অনুভব করছিলাম। তিনি আমাকে ওপরে নিয়ে গেলেন এবং আমাকে বললেন, “তোমার জন্যই আমরা অপেক্ষা করছিলাম।”

“আমি মনে মনে তাঁর সাথে থাকতে পেরে পুরোপুরি খুশি হয়েছি, তবে আমি রসুলুল্লাহ ﷺ- এর শহরটি দেখার জন্যও আগ্রহী ছিলাম। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমি কী করব?’ তিনি বললেন, ‘আগামীকাল আমি তোমার উত্তর দেব। আপাতত বিশ্রাম কর।’ তিনি আমাকে রাতের খাবার খাওয়ালেন এবং আমি তাঁর সঙ্গে রাতে নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। খুব ভোরে তিনি আমাকে তাহাজ্জুদ (মধ্যরাতের পরে) নামাজের জন্য জাগিয়ে তুললেন। তাঁর সঙ্গে নামাজের মতো শক্তি আমি আমার জীবনে কখনও অনুভব করি নি। আমি নিজেকে আল্লাহর উপস্থিতিতে অনুভব করলাম। আমার হৃদয় তাঁর প্রতি আরও বেশি আকৃষ্ট হলো।

“আমার কাছে একটি দিব্যদর্শন (ভিশন) এসেছিল। আমি দেখলাম যে, আমরা আমাদের নামাজের জায়গা থেকে একটি সিঁড়ি বেয়ে ধাপে ধাপে বাইতুল মা’মুর, বেহেশতি কাবায় পৌঁছে গেলাম। প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল একেকটি পর্যায় আর প্রতিটি পর্যায়ে আমি আমার হৃদয়ে এমন জ্ঞান লাভ করেছি যা আগে কখনও শিখি নি বা যার কথা কারুর কাছে শুনিও নি। বায়তুল মা’মুর না-পৌঁছানো পর্যন্ত শব্দ, বাক্যাংশ এবং বাক্যগুলিকে এমন এক দুর্দান্ত উপায়ে একত্র করা হয়েছিল ও আমার হৃদয়ের অভ্যন্তরে সঞ্চারিত হয়েছিল যে, প্রতিটি পর্যায়েই আমি সমুন্নত হচ্ছিলাম। সেখানে আমি ১২৪,০০০ নবি আলাইহিমুসসালামকে সালাতের জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, সাইয়্যিদিনা মুহাম্মদ ﷺ ছিলেন তাদের ইমাম। আমি নবি মুহাম্মদ ﷺ এর ১২৪,০০০ সাহাবিকে তাদের পিছনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। তারপরে আমি দেখলাম নকশবন্দি ধারার ৭,০০৭ জন ওয়ালি তাদের পিছনে সালাতের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। তারপরে আমি অন্যান্য সুফিধারার ১২৪,০০০ আউলিয়াকে সালাতের জন্য কাতারবন্দি থাকতে দেখলাম।

আবু বকর আস-সিদ্দিক (রা.) এর ঠিক ডানে  দু’জনের জন্য জায়গা ছিল। গ্র্যান্ডশেখ সেই খালি জায়গায় যান আর আমাকে তাঁর সঙ্গে নিয়ে যান। আমরা ফজরের সালাত আদায় করি। আমার জীবনে কখনওই আমি সে সালাতের মতো মিষ্টত্ব অনুভব করতে পারি নি, কারণ যখন আল্লাহর রসুল সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদ ﷺ ছিলেন সালাতের ইমাম। তাঁর আবৃত্তির সৌন্দর্য অবর্ণনীয় ছিল। এটি এমন একটি অভিজ্ঞতা ছিল যা কোনও শব্দই বর্ণনা করতে পারে না, কারণ এটি ছিল ঐশী বিষয়। সালাত শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিশনটি শেষ হয়ে গেল এবং আমি শুনলাম শেখ আবদুল্লাহ আদ্ দাগেস্তানি ق আমাকে ফজরের আযান দিতে বলছেন।”

“তিনি ফজরের সালাত আদায় করেছিলেন এবং আমি তাঁর পিছনে সালাত আদায় করলাম। বাইরে আমি শুনতে পেলাম দুটি বাহিনীর বোমাবাজি। তিনি আমাকে নকশবন্দি সুফিধারায় বায়াহ দিয়েছিলেন এবং আমাকে বললেন, ‘‘বাবা, আমাদের এমন শক্তি আছে যে এক সেকেন্ডের মধ্যে আমরা আমাদের মুরিদকে তার স্টেশনে পৌঁছে দিতে পারি। বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমার হৃদয়ের ভেতরে তাঁর চোখ দিয়ে তাকালেন; আর তা করার সাথে সাথে চোখ দুটি হলুদ থেকে লাল, পরে সাদা, পরে সবুজ এবং শেষে কালো হয়ে গেল। তিনি প্রতিটি রঙের সাথে যুক্ত জ্ঞান আমার হৃদয়ে ঢালতে থাকলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চোখের রঙও বদলাতে থাকল।”

প্রথমটা ছিলো হলুদ যা কিনা কলবের রঙ। তিনি আমার হৃদয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত ধরণের বাহ্যিক জ্ঞান ঢেলে দিয়েছিলেন। এরপর তিনি সির্ সঞ্চারিত করলেন, এতে ছিল বাকি সমস্ত চল্লিশটি তরিকার জ্ঞান যা সাইয়্যিদিনা আলি (রা.) থেকে এসেছিল, আর তাতে আমি সে সমস্ত তরিকায় নিজেকে একজন গুরু হিসাবে পেলাম। এই পর্যায়ের জ্ঞান প্রেরণ করার সময়, তাঁর চোখ লাল ছিল। তৃতীয় স্তরটি, যা সির্ আস্ সির্ কেবলমাত্র নকশবন্দি তরিকার শেখদের জন্য অনুমোদিত, যার ইমাম সাইয়্যিদিনা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। এই পর্যায় থেকে তিনি যখন আমার হৃদয়ে জ্ঞান সঞ্চারিত করলেন, তখন তার চোখের রঙ ছিল সাদা। তারপরে তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন খাফা বা গুপ্ত আধ্যাত্মিক জ্ঞানের স্তরে, তখন তাঁর চোখ সবুজ হয়ে উঠেছিল। তারপরে তিনি আমাকে সম্পূর্ণ অ্যানিহিলেশন স্টেশন, অতিগুপ্ত মাক্বাম আখফাতে নিয়ে গেলেন যা হলো পূর্ণ নির্বাণ। তার চোখের রঙ সে সময় ছিল কালো । তিনি আমাকে আল্লাহর উপস্থিতিতে নিয়ে গেলেন। এরপর তিনি আমাকে আবার অস্তিত্বে নিয়ে এসেছিলেন।”

“সে মুহূর্তে তাঁর প্রতি আমার ভালবাসা এতটাই তীব্র ছিল যে আমি তাঁর থেকে দূরে থাকার কথা কল্পনাও করতে পারছিলাম না। চিরকাল তাঁর সঙ্গে থাকতে এবং তাঁর সেবা করা ছাড়া আমি আর কিছুই চাই নি। এরপর এলো এক ঝড়! অশান্ত টর্নেডো নেমে এসে সকল প্রশান্তি তছনছ করে দিয়েছিল! পরীক্ষাটি ছিল বিশাল। আমার হৃদয় হতাশায় ভেঙে পড়ল; তিনি আমাকে বললেন, ‘বাবা, তোমার লোকেদের তোমাকে প্রয়োজন। আমি আপাতত তোমাকে যথেষ্ট পরিমাণে দিয়েছি, আজই সাইপ্রাসে চলে যাও।’ আমি তাঁর কাছে পৌঁছাতে দেড় বছর কাটিয়েছি। তাঁর সঙ্গে এক রাত অবস্থান করেছি। এখন তিনি আমাকে সাইপ্রাসে ফিরে যাওয়ার আদেশ দিচ্ছেন! এমন একটি জায়গা যেটি আমি গত পাঁচ বছরেও দেখি নি! এটি আমার পক্ষে এক ভয়ানক আদেশ ছিল, তবে তরিকাতে মুরিদকে অবশ্যই আত্মসমর্পণ করতে হবে এবং তার শেখের ইচ্ছার কাছে বশ্যতা স্বীকার করতেই হবে।”

“তার হাত-পা চুম্বন করার পরে এবং তার অনুমতি নেওয়ার পরে আমি সাইপ্রাসে যাওয়ার কোনও উপায় আছে কি না খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল। কোনও পরিবহন ছিল না। এই ভাবনাগুলি ভাবতে ভাবতে আমি যখন রাস্তায় ছিলাম তখন একজন ব্যক্তি আমার কাছে এসেছিল এবং বলল, ‘ও শেখ, আপনার কি গাড়ি দরকার?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ! আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’ তিনি বললেন, ‘ত্রিপোলিতে।’ তিনি আমাকে তাঁর ট্রাকে করে নিয়ে গেলেন এবং দুদিন পর আমরা ত্রিপোলিতে পৌঁছে গেলাম। সেখানে পৌঁছে আমি বলেছিলাম, ‘আমাকে সমুদ্র বন্দরে নিয়ে যান।’ তিনি বললেন, ‘কেন?’ আমি বললাম, ‘সাইপ্রাসে যাব, তাই জাহাজ খুঁজতে হবে।’ তিনি বললেন, ‘কিভাবে? এই ভয়াবহ যুদ্ধের সময়ে কেউ সাগরে ভ্রমণ করছে না।’ আমি বলেছিলাম, ‘কিছু মনে করবেন না, শুধু আমাকে সেখানে নিয়ে যান।’ তিনি আমাকে সমুদ্রবন্দরে নিয়ে গিয়ে সেখানে নামিয়ে দিয়েছিলেন। আমি যখন শেখ মুনির আল-মালেককে আমার দিকে আসতে দেখলাম তখন আমি অবাক হয়ে গেলাম। শেখ মুনির বললেন, ‘আপনার জন্য আপনার দাদার সেই ভালবাসা কেমন? নবি ﷺ আমার স্বপ্নে আমার কাছে আবার এসে বললেন, ‘আমার ছেলে নাজিম আসছে। তার যত্ন নিও।’”

“আমি তার সাথে তিন দিন ছিলাম। আমি তাকে সাইপ্রাসে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে বলেছিলাম। তিনি চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু যুদ্ধ এবং জ্বালানীর ঘাটতির কারণে সে সময় এটি অসম্ভব ছিল। তিনি নাবিক ছাড়া কিছুই দেখতে পেলেন না। তিনি বললেন, ‘আপনি যেতে পারেন তবে এটি বিপজ্জনক।’ আমি বলেছিলাম, ‘আমাকে অবশ্যই যেতে হবে, কারণ এটি আমার শেখের আদেশ।’ আমরা যাত্রা শুরু করলাম। সাইপ্রাসে পৌঁছতে আমাদের সাত দিন সময় লেগেছিল, এই ভ্রমণে মোটরবোটে সাধারণত চার ঘন্টা সময় লাগে।”

“আমি জাহাজ থেকে নেমে সাইপ্রাসের মাটিতে পা রাখার সাথে সাথেই আমার হৃদয়ে একটি আধ্যাত্মিক দৃষ্টি খুলল। আমি গ্র্যান্ডশেখকে দেখলাম, মাওলানা আবদুল্লাহ দাগেস্তানি ق আমাকে বলে চলেছেন, ‘ও আমার ছেলে! আমার আদেশ পালন করা থেকে কিছুই তোমাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে নি। তুমি শুনে আর মেনে নিয়ে অনেক অর্জন করেছ। এই মুহূর্ত থেকে আমি সবসময় তোমার কাছে উপস্থিত থাকব। তুমি যখনই আমার দিকে তোমার হৃদয়কে নির্দেশ করবে আমি উপস্থিত হয়ে যাব। তোমার যে কোনও প্রশ্নে তুমি সরাসরি ঐশী উপস্থিতি থেকে উত্তর পাবে। তুমি যে আধ্যাত্মিক পরিস্থিতি অর্জন করতে চাও তা তোমার সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করার কারণে তোমাকে দেওয়া হবে। আউলিয়াউল্লাহ তোমার প্রতি সকলেই খুশি, নবি তোমার উপরে খুশি। যখনই তিনি বলেছিলেন তখন থেকেই আমি তাঁকে আমার পাশে অনুভব করেছি এবং তারপর থেকে তিনি কখনওই আমাকে ছেড়ে যান নি। তিনি সবসময় আমার পাশে আছেন।”

শেখ নাজিম এরপর সাইপ্রাসে হেদায়াত ও ইসলামি শিক্ষার প্রচার শুরু করেছিলেন। অনেক লোক তাঁর কাছে এসে নকশবন্দি তরিকা গ্রহণ করেছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে এটি এমন এক সময় ছিল যখন তুরস্কে সমস্ত ধর্ম নিষিদ্ধ ছিল, এবং তিনি সাইপ্রাসের তুর্কি অংশের সদস্য হওয়ায় সেখানেও ধর্ম পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি আযান নিষিদ্ধ ছিল।

তাঁর জন্মস্থানে পৌঁছানোর পরে তাঁর প্রথম কাজটি ছিল মসজিদে গিয়ে আরবিতে আযান দেওয়া। ফল হলো, তিনি সঙ্গে সঙ্গে কারাগারে বন্দী হলেন। এক সপ্তাহ কারাগারে ছিলেন। মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিকোশিয়ার বড় মসজিদে যান এবং এর মিনার থেকে আযান দেন। এতে কর্মকর্তারা খুব রেগে গেলেন এবং তারা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেন। মামলা মোকদ্দমার অপেক্ষার সময় তিনি নিকোশিয়া এবং আশেপাশের গ্রামগুলিতে গিয়ে মিনার থেকে আযান দিতেন। ফলস্বরূপ, আরও অনেক মামলা হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে ১১৪ টি মামলা বিচারাধীন ছিল। আইনজীবীরা তাকে আযান বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি বলেছিলেন, ‘না, আমি পারব না। মানুষের অবশ্যই আযান শুনতে হবে।”

নির্দিষ্ট দিনে ১১২ টি মামলা শুনানির জন্য উপস্থাপিত হয়েছিল। অবস্থা ছিল: যদি মামলায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হন, তবে তিনি ১০০ বছরেরও বেশি সময় কারাভোগ করতে পারেন। একই দিনে, তুরস্ক থেকে নির্বাচনের ফলাফল এলো: আদনান মেন্দেরেস নামে একজন ভোটে জিতে ক্ষমতায় বসলেন। রাষ্ট্রপতি হিসাবে তাঁর প্রথম পদক্ষেপ ছিল সমস্ত মসজিদ খুলে দেওয়া এবং আরবি ভাষায় আযান দেওয়ার অনুমতি দেওয়া। এটি ছিল আমাদের গ্র্যান্ডশেখের ق একটি অলৌকিক ঘটনা। 

সে সময় শেখ নাজিম ق সমগ্র সাইপ্রাস জুড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন, এবং তারিকার শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে লেবানন, মিশর, সৌদি আরব এবং আরও অনেক জায়গায় গিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে তিনি দামেস্কে ফিরে আসেন এবং গ্র্যান্ডশেখের ق অন্যতম মুরিদ হাজ্জাহ্ আমিনা আদিলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। সেই সময় থেকে তিনি দামেস্কে থাকতেন এবং প্রতি বছর রজব, শাবান ও রমজানের তিন মাস সাইপ্রাসে যেতেন। তাঁর পরিবার তাঁর সঙ্গে দামেস্কে থাকত এবং সাইপ্রাসে গেলে তারা সেখানে যেতেন। তাঁদের দুজন মেয়ে [হাজ্জাহ নাজিহা ও হাজ্জাহ রুকাইয়া] ও দুজন ছেলে [শেখ মেহমেত ও শেখ বাহাউদ্দিন] ছিল।

 

তাঁর ভ্রমণ

মাওলানা শেখ নাজিম ق সাইপ্রিয়ট হজযাত্রীদের কাফেলার নেতা হিসাবে প্রতি বছর হজে যেতেন। তিনি মোট সাতাশ (২৭) বার হজ করেছিলেন।

তিনি গ্র্যান্ডশেখের মুরিদ ও অনুসারীদের দেখাশোনা করতেন। একসময় গ্র্যান্ডশেখ আবদুল্লাহ ق তাকে নকশবন্দি তরিকার শিক্ষা, তাসাউফের জ্ঞান এবং ধর্মীয় জ্ঞান প্রচারের জন্য দামেস্ক থেকে পায়ে হেঁটে আলেপ্পো যাওয়ার এবং পথে পথে প্রতিটি গ্রামে থামার নির্দেশ দিয়েছিলেন। দামেস্ক এবং আলেপ্পোর দূরত্ব প্রায় ৪০০ কিলোমিটার। যেতে এবং ফিরে আসতে এক বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল তার। তিনি এক-দু’দিন হাঁটতেন, একটি গ্রামে পৌঁছাতেন, এক সপ্তাহ গ্রামে কাটাতেন, নকশবন্দি তরিকা ছড়িয়ে, জিকির পরিচালনা করে ও সাধারণ লোকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে, তার পরের গ্রামের রাস্তায় নামতেন। খুব দ্রুতই তার নাম জর্দানের সীমানা থেকে আলেপ্পোর কাছাকাছি তুরস্কের সীমান্ত পর্যন্ত প্রত্যেকটি মানুষের মুখে মুখে ফিরল।

একইভাবে, গ্র্যান্ডশেখ একবার শেখ নাজিমকে সাইপ্রাসের মধ্য দিয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে হেঁটে মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। নাস্তিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বস্তুবাদ ত্যাগ করতে এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসার জন্য আহ্বান জানাতেন। তিনি সাইপ্রাস জুড়ে এতটাই সুপরিচিত হয়ে ওঠেন যে তাঁর পাগড়ির রঙ এবং জুব্বা দুটিই গাঢ় সবুজ রঙের হওয়ায় সারা দ্বীপ জুড়েই “সবুজ মাথার শেখ নাজিম” (শেহ নাজিম ইয়েসিলবাস) নামে পরিচিতি পান।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তিনি তুরস্কে একই রকমভাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ১৯৭৮ সাল থেকে প্রতি বছর তিন থেকে চার মাস তিনি তুরস্কের একেক অঞ্চল জুড়ে ভ্রমণ করেছেন। এক বছরে তিনি ইস্তাম্বুল, ইয়ালোয়া, বার্সা, এসকিসেহির এবং আঙ্কারা অঞ্চল ভ্রমণ করলেন। পরের বছরে তিনি কোনিয়া, ইস্পার্টা, কিরশেহির ভ্রমণ করলেন। আরেক বছরে তিনি দক্ষিণ সমুদ্র সৈকত, আদানা থেকে মেরসিন, আলানিয়া, ইজমির, আন্তালায় ভ্রমণ করলেন। এরপরে আর এক বছর তিনি ইরাকের সীমান্ত পর্যন্ত পূর্ব দিকের দিয়ারবাাকির, এরজুরুমে গেলেন। তিনি হয়তো আরেকবার কৃষ্ণসাগরে সমুদ্রযাত্রায় কাটালেন; এক জেলা থেকে অন্য জেলাতে গেলেন। তিনি এক শহর থেকে অন্য শহরে গিয়ে এক মসজিদ থেকে অন্য মসজিদে আল্লাহর বাণী ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং যেখানেই যেতেন সেখানে আধ্যাত্মিকতা ও ঐশী আলো ছড়িয়েছিলেন।

মাওলানা শেখ নাজিম ق যেখানেই ভ্রমণ করতেন সাধারণ মানুষ ভিড় করে অভিবাদন ও স্বগত জানাত। সরকারি লোকেরাও তাকে স্বাগত জানাতেন। তিনি পুরো তুরস্ক জুড়ে ‘আল-কিব্রিসি’ এই প্রিয় ডাকনামেই পরিচিত। তিনি ছিলেন তুরস্কের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি তুরগুত ওজালের শেখ এবং তিনি তাঁর দ্বারা অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন। মিডিয়া এবং সংবাদমাধ্যমগুলি তাঁকে যে বিস্তৃত কভারেজ দিয়েছে তার জন্য তিনি তুরস্ক জুড়ে সুপরিচিত। তুরস্কের ঘটনাবলী এবং তার ভবিষ্যতের বিষয়ে তার মতামত জানতে প্রায় প্রতি সপ্তাহে কোনও না কোনও টেলিভিশন স্টেশন এবং রিপোর্টাররা তার সাক্ষাৎকার নিচ্ছে [মাওলানার জীবদ্দশার শেষ বছরগুলির কথা বলা হচ্ছে]। তিনি নবি এর দেখানো মধ্যপন্থা  অবলম্বন করতেন; সেক্যুলারবাদী সরকার ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর মধ্যকার সূক্ষ্ম রেখা ধরে চলেন। এটি সাধারণ মানুষ এবং বুদ্ধিজীবী উভয়ের হৃদয় এবং মনে আনন্দ এবং প্রশান্তি নিয়ে আসে।

১৯৭৪ সাল থেকে মাওলানা শেখ নাজিম ق  ইউরোপ ভ্রমণ শুরু করেছিলেন; প্রতি বছর সাইপ্রাস থেকে লন্ডন বিমানে ভ্রমণ করেতেন এবং গাড়িতে করে ফিরে আসতেন। তিনি প্রতিটি দেশের বৈচিত্র্যপূর্ণ ধর্ম ও সংস্কৃতির সমস্ত ধরণের লোকের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন। লোকেরা তাঁর কাছ থেকে শাহাদাহ, তরিকা এবং আধ্যাত্মিক রহস্য গ্রহণ করে জীবন বদলে নিয়েছে।

সাইয়্যিদিনা শাহ নকশবন্দ যেমন বুখারা এবং মধ্য এশিয়ার মুজাদ্দিদ ছিলেন, যেমন সাইয়্যিদিনা আহমদ আস-সিরহিন্দি আল-মুজাদ্দেদী ছিলেন দ্বিতীয় সহস্রাব্দের পুনর্জাগরণকারী (রিভাইভার), যেমন সাইয়্যিদিনা খালিদ আল-বাগদাদী নতুনভাবে বাঁচিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের ইসলাম, শরিয়াহ ও তরিকা; এখন শেখ মুহাম্মদ নাজিম আদিল আল হাক্কানি হলেন এই যুগে প্রযুক্তি ও বস্তুগত অগ্রগতির এই কালখণ্ডে ইসলামের উদ্ধারক, পুনর্নবীকারক এবং আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী । মানুষকে আধ্যাত্মিকতার প্রথম আসল স্বাদ পাইয়ে দেওয়ার জন্য পুরো ইউরোপ জুড়ে তাঁর এই হাসিখুশি আর জ্বলজ্বলে মুখটি সকলের অত্যন্ত প্রিয়।

১৯৯১ সালে তিনি আমেরিকা যাত্রা শুরু করেছিলেন। তার প্রথম ভ্রমণে তিনি ১৫ টিরও বেশি রাজ্য পরিদর্শন করেছেন। তিনি বিভিন্ন বিশ্বাস ও ধর্মের অনেক লোকের সাথে দেখা করেছিলেন: মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি, শিখ, বৌদ্ধ, হিন্দু এবং নিউ এজ বিলিভার্স । এর ফলে উত্তর আমেরিকায় নকশবন্দী তরিকার ১৫ টিরও বেশি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি ১৯৯৩ সালে দ্বিতীয়বার আমেরিকা এসেছিলেন এবং বহু নগর ও শহরে ভ্রমণ করেছিলেন; ঘুরে দেখেছিলেন বহু মসজিদ, গির্জা, সিনাগগ ও মন্দির। তাঁর মাধ্যমে উত্তর আমেরিকায় ১০,০০০ এরও বেশি লোক ইসলামে প্রবেশ করেছে এবং নকশবন্দি তরিকায় দীক্ষা নিয়েছে।

১৯৮৬ সালে, মাওলানা শেখ নাজিমকে দূরপ্রাচ্যে ভ্রমণ করার জন্য ডাকা হয়েছিল: ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা। তিনি এই দেশগুলির প্রতিটি বড় শহর পরিদর্শন করেছিলেন। সুলতান, রাষ্ট্রপতি, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা এবং অবশ্যই সর্বত্র সাধারণ মানুষ তাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাকে ব্রুনাইয়ের যুগের সাধক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। জনগণের উদারতা এবং বিশেষত সুলতান, হাজি হাসানাল বলকিয়াহ তাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি মালয়েশিয়ায় নকশবন্দি তরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শেখ হিসাবে বিবেচিত হন। পাকিস্তানে তিনি তরিকতের উদ্ধারক হিসাবে স্বীকৃত এবং তাঁর হাজার হাজার মুরিদ রয়েছে। শ্রীলঙ্কায়, কর্মকর্তা এবং সাধারণ লোকদের মধ্যে থেকে প্রায় ২০,০০০ এর বেশি মানুষ তার মুরিদ হয়েছেন। তিনি সিঙ্গাপুরের মুসলমানদের মধ্যে বেশ সম্মানিত এবং সেখানে অনেক মুরিদ রয়েছে।

তিনি বহুবার লেবানন সফর করেছিলেন, যেখানে আমরা [মাওলানা শেখ হিশাম কাব্বানি ও তার পরিবার] তাঁকে জেনেছিলাম। একদিন আমি আমার চাচার অফিসে ছিলাম। তিনি লেবাননের উচ্চ পদস্থ সরকারী পদে ধর্ম বিষয়ক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আসরের সময় ছিল। আমার চাচা শেখ মুখতার আলায়লি বৈরুতের আল-উমারি আল কবির মসজিদে নামাজ পড়তেন। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর সময়ে মসজিদটি একটি গির্জা ছিল এবং তাঁর সময়েই তা মসজিদে রূপান্তরিত হয়েছিল। মসজিদের নীচে এখনও গির্জার ভিত্তি রয়েছে। আমার চাচা নামাজে ইমামতি করছিলেন; আমার দুই ভাই এবং আমি তাঁর পিছনে নামাজে পড়ছিলাম। একজন শেখ এসে আমাদের পাশে নামাজ আদায় করলেন। তিনি আমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে তাঁকে বললেন, ‘তুমি কি অমুক না?’ তার নাম বললেন। তিনি আমার অন্য ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে তার নাম ধরে ডাকলেন। তিনি আমার দিকে তাকিয়েছিলেন এবং আমার নাম ধরেও ডেকেছিলেন। আমরা এটি দেখে খুব অবাক হলাম, কারণ আমরা তাকে আগে কখনও দেখি নি। আমার চাচাও তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হলেন।

আমার বড় ভাই আমাদের বাড়িতে শেখ নাজিমকে অতিথি করার জন্য জোরাজুরি করলেন আর আমার চাচা আমাদের সাথে এসেছিলেন। আমাদের অতিথি [শেখ নাজিম ق] বলেছিলেন, “শেখ আবদুল্লাহ ق আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, ‘তোমার ডানদিকে আসরের নামাজের পরে একজনের নাম অমুক, অন্যজনের নাম অমুক এবং আরেকজনের নাম অমুক থাকবে। তাদের নকশবন্দি তরিকায় বায়াত কর। তারা আমাদের অনুগামীদের মধ্যে হতে যাচ্ছে।’ তিনি সবার নাম ধরে ডেকে আমাদেরকে অবাক করে দিয়েছিলেন এবং তাঁর প্রতি আমাদের আকৃষ্ট করেছিলেন। আমি বিশেষত তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম অনেক কম বয়সেই ।

সেই থেকে তিনি নিয়মিত বৈরুত ভ্রমণ করাকে অভ্যেসে পরিণত করেছিলেন। আমরা গ্র্যান্ডশেখ আবদুল্লাহ ق এবং শেখ নাজিমকে ق দেখতে প্রতি সপ্তাহে দামেস্কে যেতাম। আমরা প্রচুর আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন করেছি এবং দেখেছি যে তারা আধ্যাত্মিক শক্তি মুরিদদের হৃদয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আমরা তাদের প্রতি এতটাই আকৃষ্ট হয়েছিলাম যে আমরা আমাদের বাবাকে সবসময়ই অনুরোধ করতাম যেন তিনি প্রতি রবিবার তাদের কাছে নিয়ে যান।

মাওলানা শেখ নাজিমের ق বাড়ি কখনই দর্শনার্থী ছাড়া ছিল না। প্রতিদিন অন্তত একশত দর্শনার্থী তাঁর বাড়িতে যেত। তিনি তাদের প্রত্যেকের খেদমত করতেন। দামেস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে গ্র্যান্ডশেখের বাড়ির কাছে জাবাল কাসিয়ুন পাহাড়ে তাঁর বাড়ি ছিল। তিনি একটি ছোট স্টুকো বাড়িতে থাকতেন। সেখানে সবকিছু হাতে-তৈরি ছিল, হয় কাঠের  বা অন্য কোনও সহজ প্রাকৃতিক উপকরণের।

 

তার সেক্লুশন বা খালওয়াহ্

জর্ডানের সুয়েল শহরে শেখ আবদুল্লাহ দাগেস্তানির ق আদেশে ১৯৫৫ সালে মাওলানা শেখ নাজিমের ق প্রথম খালওয়া বা আধ্যাত্মিক নির্জনবাস হয়েছিল। সেখানে তিনি ছয় মাস সেই সেক্লুশনে অতিবাহিত করেছিলেন। তাঁর উপস্থিতির তীব্রতা এবং চরিত্রের বিশুদ্ধতা হাজার হাজার মুরিদকে আকৃষ্ট করেছিল। তখন সুয়েল এবং এর আশেপাশের গ্রামগুলি, রামতা এবং আম্মান মাওলানা শেখদের মুরিদ বা অনুসারীতে পূর্ণ হয়ে ওঠে। ইসলামি পণ্ডিত, কর্মকর্তা এবং প্রচুর সংখ্যক লোক তাঁর আলো ও ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হয়েছিল।

তখন তিনি অনেক তরুন, তার কেবল দুটি সন্তান: এক কন্যা এবং এক পুত্র (হাজ্জা নাজিহা, শেখ মেহমেত)। তখন তাকে আমাদের গ্র্যান্ডশেখ শেখ আবদুল্লাহ দাগেস্তানি ق ডেকেছিলেন। তিনি তাকে বলেছিলেন, “বাগদাদে সাইয়্যিদিনা আবদুল কাদির জিলানির ق মসজিদে তোমার খালওয়াহ্ করার জন্য আমি নবি করিম এর কাছ থেকে আদেশ পেয়েছি। সেখানে গিয়ে ছয় মাস খালওয়াতে কাটিয়ে এস।”

সেই ঘটনাটি বর্ণনা করে শেখ নাজিম ق বলেছেন, “[এ কথা শুনে] আমি মাওলানা শেখকে কোনও প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি নি; এমনকি আমার বাড়িতেও ফিরে যাই নি। আমি তৎক্ষণাৎ মারজা শহরের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। আমি ভাবিও নি যে, আমার জামাকাপড় দরকার, অর্থের দরকার, রসদ দরকার। তিনি যখন বলেছিলেন, ‘যাও!’ আমি চলে গেলাম। আমি সাইয়্যিদিনা আবদুল কাদির ق এর সঙ্গে নির্জনবাস করতে ব্যাকুল ছিলাম। আমি সরাসরি মারজায় চলে গেলাম। হাঁটতে হাঁটতে যখন শহরে পৌঁছে গেলাম, দেখি একজন লোক আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি আমার দিকে তাকালেন এবং তিনি আমাকে চিনতে পারলেন। তিনি বললেন, ‘ও শেখ নাজিম, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’ আমি বললাম, ‘বাগদাদে।’ তিনি গ্র্যান্ডশেখের মুরিদ ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি নিজেও বাগদাদ যাচ্ছি!’ তিনি বাগদাদ পৌঁছে দেওয়ার জন্য ট্রাকে করে মালামাল নিয়ে এসেছিলেন। তাই তিনি আমাকে তার সঙ্গে নিয়ে গেলেন।” 

“আমি যখন সাইয়্যিদিনা আবদুল কাদির জিলানী ق -র মসজিদে প্রবেশ করলাম সেখানে এক বিশালাকার লোক মসজিদের দরজা বন্ধ করছিলেন। তিনি বললেন, ‘শেখ নাজিম!’ ‘জি,’ আমি উত্তর দিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি এখানে থাকাকালীন আমিই আপনার খেদমতে থাকব। আমার সাথে আসুন।’ আমি এতে অবাক হলাম, তবে আমার হৃদয় এতটুকু আশ্চর্য হয় নি, কারণ আমরা তরিকাতে জানি যে সবকিছু সর্বদা ঐশী উপস্থিতির মাধ্যমে সাজানো থাকে। তিনি গাউস আল-আজমের কবরের কাছে যেতে আমি তাকে অনুসরণ করলাম এবং আমার মহান প্রপ্রপিতামহ, সাইয়্যিদিনা আবদুল কাদির জিলানী ق কে সালাম জানালাম। তারপরে তিনি আমাকে একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘প্রতিদিন আমি আপনাকে এক টুকরো রুটির সাথে এক বাটি মসুর ডাল পরিবেশন করব।’”

“আমি কেবল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য আমার ঘর থেকে বের হতাম। তা ছাড়া আমি আমার পুরো সময়টি সেই ঘরেই কাটিয়েছি। আমি এমন অবস্থায় পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলাম যে, নয় ঘন্টার মধ্যে পুরো কোরআন তিলাওয়াত করতে পারতাম। এর সঙ্গে ১,২৪,০০০ বার কালিমার (লা- ইলাহা ইল্লাল্লা-হ) যিকর করেছি এবং সমগ্র দালায়েলুল খায়রাতের [ইমাম জাজুলি (ق) রচিত/সংকলিত রসুল এর প্রতি সালাওয়াতের একটি প্রাচীন বই] পাশাপাশি ১,২৪,০০০ বার নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর সালওয়াত পাঠ করেছি। এদের সঙ্গে যোগ করা হয়েছিল প্রতিদিন ৩,১৩,০০০ বার ‘আল্লাহ-আল্লাহ’ যিকর। এ ছাড়াও পাশাপাশি আমাকে বিভিন্ন তাসবিহ ও নামাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রতিদিন আমার কাছে ভিশনের পর ভিশন [রুহানি অভিজ্ঞতা] উপস্থিত হতো। এই দিব্যদর্শনগুলো আমাকে ঐশী উপস্থিতিতে বিলীন না হওয়া পর্যন্ত এক স্তর থেকে অন্য স্তরে বা মাকামে নিয়ে গিয়েছিল।”

“একদিন একটি দিব্যদৃষ্টি এলো যে, সাইয়্যিদিনা আবদুল কাদির জিলানী ق আমাকে তাঁর কবরে ডাকছেন এবং তিনি বলছেন, ‘ও আমার সন্তান [বংশধর] আমি আমার কবরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। এস! দ্রুত আমি গোসল করলাম, দু’রাকাত সালাত আদায় করলাম এবং তার সমাধিতে গেলাম যা আমার ঘর থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে ছিল। সেখানে পৌঁছে আমি মনঃসংযোগ (রাবিতা) ও ধ্যান (মুরাকাবা) করতে শুরু করি এবং বললাম, ‘সালাম আলাইকা ইয়া জিদ্দি’ (‘ও আমার দাদা আপনার প্রতি সালাম’)। সঙ্গে সঙ্গে আমি তাকে কবর থেকে বেরিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। তাঁর পেছনে বিরল পাথর দিয়ে সজ্জিত একটি দুর্দান্ত সিংহাসন ছিল। তিনি আমাকে বললেন, ‘আমার সঙ্গে এস এবং এই সিংহাসনে আমার সাথে বস।’

“আমি তাঁর পাশে নাতির সাথে দাদার মতো বসেছিলাম। তিনি হাসছিলেন এবং বলছিলেন, ‘আমি তোমাকে নিয়ে খুশি। তোমার শেখ আবদুল্লাহ আল ফায়েজ আদ দাগেস্তানির ق মাক্বাম, নকশবন্দি তরিকাতে অনেক উঁচু। আমি তোমার দাদা এবং গাউসুল আজম হিসাবে যে শক্তি বা তাজাল্লি আমি বহন করি এখন সরাসরি তোমাকে তা দিচ্ছি। আমি এখন তোমাকে সরাসরি কাদিরি তরিকাতে দীক্ষা (বায়াহ্) দিচ্ছি ।”

যখন শেখ নাজিম ق তাঁর নির্জনবাস (খালওয়াহ্) শেষ করলেন এবং চলে যাবেন, তখন তিনি সাইয়্যিদিনা শেখ আবদুল কাদির জিলানীর ق সমাধিতে বিদায় জানাতে গেলেন। সাইয়্যিদিনা আবদুল কাদির জিলানী ق দৈহিকভাবে তাঁর কাছে হাজির হয়ে বললেন, “ও আমার আওলাদ! তুমি নকশবন্দি তরিকাতে যে সমস্ত মাক্বামে পৌঁছে গেছ তাতে আমি খুব খুশি। আমি কাদিরি তরিকাতে তোমার বায়াহ্ নবায়ন করছি।” সাইয়্যিদিনা শেখ আবদুল কাদির জিলানী ق তখন আরও বলেছিলেন, “ও আমার নাতি, আমি তোমাকে আমার সাক্ষাতের একটি স্মারক দিচ্ছি।” তিনি তাকে জড়িয়ে ধরে দশটি মুদ্রা দিলেন। এই মুদ্রাগুলি যখন শেখ আবদুল কাদির জিলানী ق জীবিত ছিলেন তখনকার, আমাদের সময়কার নয়। শেষ দিন পর্যন্ত শেখ নাজিম সে মুদ্রাগুলি নিজের কাছে রেখেছিলেন।

চলে যাওয়ার আগে, যে শেখ সে খালওয়াকালে তার সেবা করেছিলেন, মাওলনা নাজিম ق তাকে তার জুব্বা স্মারক হিসাবে দিয়েছিলেন। তিনি তাকে বলেছিলেন, “আমি আমার সমস্ত খালওয়ার সময়ে এই জুব্বাটি ব্যবহার করতাম, হয় ঘুমানোর মাদুর হিসাবে অথবা নামাজ পড়ার সময় এবং জিকির্ করার সময় পোশাক হিসাবে। এটি রাখুন এবং আল্লাহ আপনাকে দয়া করবেন এবং সাইয়্যিদিনা মুহাম্মদ আপনাকে আশীর্বাদ করবেন এবং এই তরিকার সমস্ত মাশায়েখ আপনাকে দোয়া করবেন। শেখ চাদরটি নিলেন, চুম্বন করলেন এবং পরলেন। মাওলানা শেখ নাজিম ق এরপর বাগদাদ ছেড়ে সিরিয়ার দামেস্কে ফিরে গেলেন।

১৯৯২ সালে, যখন শেখ নাজিম পাকিস্তানের লাহোর সফর করছিলেন, তিনি শেখ আলী হুজবেরির ق সমাধি যিয়ারতে গিয়েছিলেন। কাদিরি তরিকার শেখ তাকে তাঁর বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছিলেন এবং শেখ নাজিম ق সেখানে রাত কাটিয়েছিলেন। ফজরের সময় কাদিরি শেখ বলেছিলেন, “শেখ, আমি আজকে আপনাকে এখানে রেখেছি একটি অতি মূল্যবান জুব্বা দেখাতে, যা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে ২৭ বছর আগে পেয়েছি। এটি বাগদাদে কাদিরি তরিকার এক মহান শেখ থেকে অন্য আরেক শেখকে প্রেরণ করা হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত এটি আমাদের কাছে পৌঁছয়। আমাদের শেখগণ এটিকে রেখেছেন এবং সংরক্ষণ করেছেন, কারণ এটি ছিল তাঁর সময়ের গাউসের ব্যক্তিগত পোশাক (জুব্বা)।

“নকশবন্দি তরিকার এক তুর্কি শেখ সায়্যিদিনা গাউসুল আজম আবদুল কাদির জিলানির ق মসজিদ ও সমাধিতে খলওয়াহতে ছিলেন। যখন সেই শেখ তাঁর খলওয়াহ শেষ করেন, তখন তিনি একজন কাদিরি শেখকে যিনি তাঁর সে নির্জনবাসকালে (খালওয়াহ) তাঁর সেবা করেছিলেন, তাকে উপহার হিসাবে একটি জুব্বা দিয়েছিলেন। কাদিরি শেখ তাঁর মৃত্যুর আগে তাঁর উত্তরসুরীদের এই জুব্বাটির খুব যত্ন নেওয়ার আদেশ করেছিলেন, কারণ যদি কেউ তা পরেন, তবে তিনি যে কোনও অসুস্থতা থেকে নিরাময় পেয়ে যান। জুব্বা পরলে ঐশী পথের যে-কোনও সন্ধানকারী (সালেক) সহজেই দিব্যদর্শনের উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হবে।”

তিনি আলমারিটি খুললেন এবং একটি কাঁচের বাক্সে সংরক্ষিত অবস্থায় পোশাকটি দেখা গেল। তিনি বাক্সটি খুলে জুব্বাটি বের করলেন। শেখ নাজিম হাসছিলেন। শেখ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “শেখ, আপনি হাসছেন কেন?”  শেখ নাজিম বলেছিলেন, “এটি আমার জন্য খুবই সুখের। আমার খালওয়ার শেষে আমি কাদিরি শেখকে এই জুব্বা দিয়েছিলাম।” কাদিরি শেখ এই কথা শুনে মাওলানা শেখ নাজিমের হাত চুম্বন করলেন, কাদিরি তরিকাতে তাঁর দীক্ষা (বায়াহ) নবায়ন করতে অনুরোধ করলেন এবং নকশবন্দি তরিকাতে বায়াত হতে চাইলেন। আল্লাহর ওয়ালিগণ যেখানেই যান না কেন আল্লাহ তার তাঁর সন্ত ও প্রিয় বান্দাদের মাধ্যমে তাদের যত্ন নেন।

 

মদিনায় খালওয়াহ

মাওলানা শেখ নাজিমকে বহুবার খালওয়াতে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এগুলো ৪০ দিন থেকে এক বছর পর্যন্ত দীর্ঘ ছিল। বাইরের যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্নতার মাত্রাতেও খালওয়াহগুলো বিভিন্ন রকমের ছিল: কখনও কখনও কোনও যোগাযোগ ছিল না; মাঝে মাঝে জামাআতের সঙ্গে প্রতিদিনের নামাজ আদায় করার মাধ্যমে অল্প পরিমাণে যোগাযোগ ঘটত; এবং কখনও কখনও সমাবেশ, বক্তৃতা বা যিকিরের জন্য আরও লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগের অনুমতি ছিল। তিনি নবি এর শহর মদিনাতে বহুবার খালওয়াহ করেছিলেন। 

মাওলানা শেখ নাজিম বলেছেন: 

“কারুরই তার শেখের সঙ্গে নির্জনবাস বা খালওয়াহ করার সৌভাগ্য কখনও হয় নি। আমার শেখের সঙ্গে মদিনা আল-মুনাওয়ারাতে একই ঘরে খালওয়াহ অর্জনের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। এটি ছিল নবি ﷺ এর পবিত্র মসজিদের নিকটে একটি প্রাচীন কক্ষে। এর একটি দরজা ও একটি জানালা ছিল। আমি আমার শেখ মাওলানা আবদুল্লাহ ফায়েজ আদ দাগেস্তানি ق কে নিয়ে ঘরে ঢুকতেই সঙ্গে সঙ্গে তিনি উপরে উঠে জানালাটি বন্ধ করে দিলেন। তিনি আমাকে নবি এর পবিত্র মসজিদে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্যই শুধু ঘর ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন।”

“যখন আমি নামাজের জন্য যেতাম আমার শেখ আমাকে ‘নজর বার কদম,’ ‘প্রতি পদক্ষেপ খেয়াল করা’র অনুশাসন চালিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। নিজেকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা ও দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই অনুশীলনটি হচ্ছে সর্বশক্তিমান ও সার্বভৌম আল্লাহ সুবহানু ওয়া তা’আলা, এবং তাঁর নবি ব্যতীত সমস্ত কিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি মাধ্যম। ”

“আমার শেখ আবদুল্লাহ ফায়েজ আদ দাগেস্তানি ق কখনই সেই খালওয়াহতে ঘুমান নি। এক বছরের জন্য আমি কখনওই তাকে ঘুমাতে দেখি নি। তিনি কখনওই খাবার ছুঁয়ে দেখেন নি। আমাদের প্রতিদিন এক বাটি মসুর ডাল এবং এক টুকরো রুটি দেওয়া হতো। তিনি সবসময় আমাকে তার অংশ দিতেন। তিনি কেবল পানি খেতেন। তিনি কখনওই সেকলুশনের ঘরটি ছেড়ে বের হন নি।”

“দিনের পর দিন এবং রাতের পর আমার শেখ প্রদীপের আলোতে কোরআন শরীফ পড়তেন, জিকির করতেন ও কখনও দু’হাত তুলে দু’আ করতেন। কয়েক ঘন্টা ধরে তিনি দু’আ করতেন এবং একটি দোয়া আর কখনও দ্বিতীয়বার করেন নি। প্রত্যেকবারের দু’আ একে অপরের থেকে আলাদা ছিল এবং পুরো বছর জুড়ে তিনি কখনও একই দু’আর পুনরাবৃত্তি করেন নি। কখনও কখনও তার করা দু’আর ভাষা আমি বুঝতে পারতাম না, কারণ তা কোনও বেহেশতি ভাষা ছিল। আমি শুধু আমার হৃদয়ে আসা কোনও দিব্যদর্শন ও অনুপ্রেরণার মাধ্যমেই এই দু’আগুলি বুঝতে পারতাম।”

“নামাজ বাদ দিয়ে কখন রাত বা দিন এল আমি জানতে পারতাম না। গ্র্যান্ডশেখ আবদুল্লাহ ق পুরো এক বছরের জন্য দিনের আলো দেখেন নি, কেবল মোমবাতির আলো। আমি শুধু নামাজ পড়তে যাওয়ার সময়ই দিনের আলো দেখতাম।

“সেই নির্জনতার মধ্য দিয়েই আমি আধ্যাত্মিকতার বিভিন্ন স্তরে উন্নীত হয়েছিলাম। একদিন আমি তাকে বলতে শুনেছি, “হে আল্লাহ আপনি আপনার নবিকে () সুপারিশ করার যে শক্তি দান করেছেন, আমাকে তার থেকে সুপারিশের শক্তি দান করুন। কেয়ামতের দিন আপনার মহান ঐশী উপস্থিতিতে সমস্ত মানুষকে নেওয়ার জন্য যেন সুপারিশ করতে পারি।” তিনি বলছিলেন আর তখন আমি একটি ভিশনে (রুহানি দর্শন বা দিব্যদর্শন) বিচার দিবসটি দেখতে পেলাম, সর্বশক্তিমান ও সার্বভৌম আল্লাহ সুবাহানু ওয়া ত’আলা তাঁর আরশে (সিংহাসনে) এসে মানুষের বিচার করছেন। নবি  সে ঐশী উপস্থিতির ডানদিকে ছিলেন। গ্র্যান্ডশেখ ق রসুলুল্লাহ ﷺ এর ডানদিকে ছিলেন এবং আমি গ্র্যান্ডশেখের ডানদিকে ছিলাম।”

“আল্লাহ সকলের বিচার করার পরে রসুলুল্লাহ কে হস্তক্ষেপের অনুমতি দিলেন। যখন নবিজি সুপারিশ ও মধ্যস্থতা করে শেষ করলেন, তখন তিনি গ্র্যান্ডশেখকে আদেশ করলেন তাঁর আশীর্বাদ দিতে এবং তাকে যে আধ্যাত্মিক শক্তি তিনি দিয়েছিলেন তা দিয়ে মানুষকে তুলে আনতে (সাহায্য করতে)। সেই দিব্যদৃষ্টিটি হচ্ছিল আর আমার শেখকে বলতে শুনলাম, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, নাজিম এফেন্দি, আমি উত্তর পেয়েছি।’”

“এমন ভিশন/দিব্যদর্শন অব্যাহত ছিল। একদিন আমি ফজরের নামাজ থেকে ফিরে আসার পরে গ্র্যান্ডশেখ আবদুল্লাহ ফায়েজ আদ দাগেস্তানি ق আমাকে বললেন, ‘নাজিম এফেন্দি, দেখ!’ আমার কোথায় তাকানো উচিত: উপরে, নীচে, ডানে না বাম দিকে? আমার মনে বার্তা এলো: তাঁর হৃদয়ের দিকে তাকাও। আমি তাঁর হৃদয়ের দিকে তাকানো মাত্রই আমার কাছে এক বিশাল উন্মোচন ঘটে গেল এবং আমি দেখলাম সাইয়্যিদিনা আবদুল খালিক আল-গুজদ্ওয়ানি ق [নকশবন্দি গোল্ডেন চেইনের ১১ নম্বর গ্র্যান্ডশেখ] তার শারীরিক অবয়বে উপস্থিত হয়ে আমাকে বললেন, ‘ও আমার সন্তান, তোমার শেখ অনন্য। তাঁর মতো কেউ আর আগে আসে নি।’ তারপরে তিনি গ্র্যান্ডশেখ আবদুল্লাহ ق আর আমাকে তার সঙ্গে যেতে  বললেন।”

“মুহূর্তের মধ্যে আমরা সাইয়্যিদিনা আবদুল খালিকের ق সঙ্গে এই পৃথিবীর অন্য এক জায়গায় নিজেদের দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, আল্লাহ পরাক্রমশালী ও সার্বভৌম, আমাকে সেই পাহাড়ের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।’ আমরা তাঁকে অনুসরণ করে একটি পাহাড়ে গেলাম। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ আমাকে এই শিলাটিতে আঘাত করার নির্দেশ দিয়েছেন।’ তিনি যখন শিলাটিকে আঘাত করলেন তখন সেই শিলা থেকে অবিশ্বাস্য জলস্রোত প্রবাহিত হতে শুরু করল, যা এর আগে আমি কখনও দেখি নি। সাইয়্যিদিনা আবদুল খালিক ق বললেন, ‘এই যে পানি আজ বের হচ্ছে এবং বিচার দিবস পর্যন্ত এভাবেই প্রবাহিত হতে থাকবে। ’

“তখন তিনি বলেছিলেন, ‘মহান আল্লাহ আমাকে বলেছেন যে তিনি এই পানির প্রতিটি ফোঁটা থেকে নূরের ফেরেশতা সৃষ্টি করে যাচ্ছেন, যা বিচারদিবস পর্যন্ত তাঁর তাসবিহ্ করতে থাকবে। এবং তিনি আমাকে এই বলে আদেশ দিয়েছেন যে, ‘হে আমার বান্দা আবদুল খালিক আল-গুজদাওয়ানি, তোমার কাজ প্রত্যেক ফেরেশতাকে তার নাম দেওয়া। তুমি দুবার কোনও নাম ব্যবহার করতে পারবে না। তোমাকে অবশ্যই প্রত্যেকের নাম আলাদা আলাদা করে রাখতে হবে এবং তাদের প্রশংসার তাসবিহ্ গুণে দিতে হবে। তুমি তাদের প্রশংসার পুরস্কারগুলি নকশবন্দি তরিকার অনুসারীদের মধ্যে ভাগ করে দেবে। সে দায়িত্ব তোমার।’ তারপরে সেই রুহানি সফর শেষ হয়েছিল। আমি সাইয়্যিদিনা আবদুল খালিক আল-গুজদাওয়ানির ق প্রতি খুবই আকৃষ্ট হয়েছিলাম। তাঁর অবিশ্বাস্য কাজ আমাকে বিস্মিত করেছিল।”

“এ ধরনের রুহানি অভিজ্ঞতা আমার উপর্যুপরি হচ্ছিল। আমাদের খালওয়ার শেষ দিনে, ফজরের সালাতের পরে আমি ঘরের বাইরে কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। আমি একটি বিশাল কণ্ঠস্বরে কাউকে কাঁদতে শুনলাম এবং সে সঙ্গে অনেক অনেক বাচ্চার কান্নার মতো ছোট ছোট আওয়াজ পেলাম। সে কান্না থামে নি, আর আমার অনুমতি ছিল না বলে আমি বাইরে গিয়ে দেখতে পারি নি । কান্নার শব্দ ক্রমশ বাড়তে থাকল এবং কয়েক ঘন্টা অব্যাহত ছিল।”

“গ্র্যান্ডশেখ আবদুল্লাহ ق আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নাজিম এফেন্দি, তুমি কি জানো কে কাঁদছে?’ যদিও আমি জানতাম যে এটি মানুষের কান্না নয়, আমি বলেছিলাম, ‘সাইয়্যিদি, আপনি আরও ভাল জানেন।’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, ‘এরা হচ্ছে ইবলিস (শয়তান) এবং তার বাহিনি। তারা কেন কাঁদছে জানো?’ আমি বলেছিলাম, ‘ইয়া সাইয়্যিদি, আপনি আরও ভাল জানেন।’ তিনি বললেন, ‘শয়তান তার বাহিনির কাছে ঘোষণা করেছে যে, এই পৃথিবীর দু’জন লোক তাদের নিয়ন্ত্রণ থেকে পালিয়ে গেছে।’

“তখন আমি একটি ভিশনে দেখতে পেলাম যে শয়তান ও তার সৈন্যরা একটি বেহেশতি শেকলে শৃঙ্খলিত, এ কারণে তারা আমার শেখ ও আমার কাছে পৌঁছাতে পারে নি। সেই দর্শনের অবসান হল। তখন গ্র্যান্ডশেখ ق আমাকে বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, রসুলুল্লাহ তোমার উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমিও সন্তুষ্ট।’ এরপর তিনি আমার বুকে হাত রাখলেন। আমি তাৎক্ষণিক নবি সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদ সহ ১২৪,০০০ নবি আলাইহিমুসসালাম, ১২৪,০০০ সাহাবা, ৭০০৭ জন নকশবন্দি আউলিয়া, ৩১৩ জন আউলিয়া, পাঁচজন কুতুব এবং গাউসকে দেখলাম। তারা সবাই আমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন এবং তারা প্রত্যেকেই তাদের ঐশী জ্ঞান আমার হৃদয়ে ঢেলে দিচ্ছেন। আমি তাদের কাছ থেকে নকশবন্দী তরিকার রহস্য এবং অন্যান্য ৪০ টি তরিকার রহস্য লাভ করছি।”

 

তাঁর অলৌকিক নিদর্শন

১৯৭১ সালে মাওলানা শেখ নাজিম ق সাইপ্রাসে ছিলেন রজব, শা’বান এবং রমজান, এই তিন মাসের জন্য; এটা তার অভ্যাস ছিল। একদিন শা’বান মাসে আমরা বৈরুত এয়ারপোর্ট থেকে কল পেলাম মাওলানা শেখ নাজিম ق আমাদেরকে [মাওলানা শেখ হিশাম কাব্বানি এখানে তাদের নিজেদের পরিবারের একটি ঘটনা বর্ণনা করছেন] এসে তাঁকে নিয়ে যেতে বলছেন। আমরা অবাক হয়েছিলাম তিনি আসছেন বলে, কারণ আমরা তাঁকে সে সময়টিতে আশা করি নি। তো আমরা তাকে গিয়ে নিয়ে এলাম। তিনি আমাদের বললেন, ‘নবিজি  মুহাম্মাদ আমাকে আদেশ করেছেন যেন আমি আজ তোমাদের বাড়ি আসি, কারণ হলো তোমাদের বাবা আজ মারা যাবেন। আমার তাকে গোসল দিতে হবে, কাফন পরাতে হবে ও কবর দিতে হবে। এরপর আমাকে সাইপ্রাস ফিরে যেতে হবে।’ আমরা বললাম, ‘মাওলনা, আমাদের বাবা তো সুস্থ আর তার কোনও সমস্যা হয় নি।” তিনি বললেন, “আমাকে এমনই নির্দেশ করা হয়েছে।’ তিনি একেবারে সুনিশ্চিত ছিলেন এবং যেহেতু আমাদের শিক্ষা ছিল শেখের কথা বা কাজকে সম্পূর্ণ মেনে নেবার, আমরা তাঁর কথা পুরোপুরি মেনে নিলাম।

তিনি আমাদের পরিবারকে জড়ো করতে এবং শেষবারের মতো বাবাকে একবার দেখতে আসতে বলেছিলেন। আমরা মাওলানা শেখের কথা বিশ্বাস করেছিলাম এবং আমরা সমস্ত পরিবারকে আসতে বলেছিলাম। প্রত্যেকে অবাক হয়ে গিয়েছিল এবং যখন তাদের ডেকেছিলাম কেউ কেউ তখন বিশ্বাস করে নি; কেউ এসেছিল এবং কেউ আসে নি। আমার বাবা এই বিষয়ে কিছুই জানতেন না, তিনি দেখছিলেন আত্মীয়রা তাকে সাধারণ ঘটনার মতোই দেখতে আসছে। ঘড়িতে তখন পৌনে সাতটা। মাওলানা শেখ বললেন, ‘এখন তোমাদের বাবার অ্যাপার্টমেন্টে যেতে হবে, তিনি যখন চলে যাবেন তার জন্য কোরআনুল করিম থেকে ইয়াসিন আশ-শরীফ তেলাওয়াত করতে হবে।’ তিনি নীচে আমাদের ফ্ল্যাট থেকে আমার বাবার ফ্ল্যাটে উঠলেন। আমার বাবা ঘরে ঢুকতে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন। বাবা বলেছিলেন, ‘শেখ নাজিম, অনেক দিন হলো আমরা আপনাকে কুরআন তিলাওয়াত করতে শুনেছি, আপনি কি আমাদের জন্য আবার পড়বেন না?’ তখন শেখ নাজিম কুরআন শরিফের সুরাতুল ইয়াসিন পড়তে শুরু করলেন। তিনি যখন সুরাটির তেলাওয়াত শেষ করেছিলেন, তখন ঘড়ির কাঁটা ঠিক সাতটায় এসে গেল। ঠিক তখনই বাবা চিৎকার করে বললেন, ‘আমার হার্ট, আমার হার্ট!’ আমরা তাকে শুইয়ে দিলাম; আমার ভাই ও বোন উভয়ই ডাক্তার ছিল, বাবাকে পরীক্ষা করল। তারা দেখল বাবার হার্ট নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্পন্দিত হচ্ছে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

প্রত্যেকে শেখ নাজিমের ق দিকে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। ‘ইনি কীভাবে জানলেন?’ আমরা ভাবছিলাম। ‘তিনি এই জন্য সাইপ্রাস থেকে এসেছিলেন? তিনি কোন ধরনের সাধক? তিনি কেমন করে সে সময়টি এত নির্ভুলভাবে জানতে পেলেন? তিনি কী ধরণের রহস্য তার অন্তরে বহন করেন? কেমন সন্ত তিনি লোকে যা জানে না, তা তিনি জানেন?’

তিনি যে রহস্য বহন করেন তা তাঁর প্রতি আল্লাহর ভালবাসা এবং করুণার ফল। তিনি সালাতসহ সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম পালন করেন ও তাঁর পবিত্র কোরআনকে সম্মান করেন। এভাবে তিনি ইসলাম ধর্মের প্রতি একনিষ্ঠতা, তাকওয়া ও আনুগত্য বজায় রেখেছিলেন বলেই আল্লাহ তা’আলা তাকে সেই ক্ষমতা ও ভবিষ্যত-দৃষ্টি দিয়ে শক্তিশালী করেছিলেন।  তিনি তাঁর পূর্ববর্তী নকশবন্দি সুফিধারারর সকল আউলিয়ার মতো, তাঁর পূর্বপুরুষ সাইয়্যিদিনা আবদুল কাদির জিলানী ق ও সাইয়্যিদিনা জালালউদ্দীন রুমির ق মতো, এবং মহিউদদীন ইবনে আরবির ق  মতো যারা ১৪০০ বছর ধরে ইসলামের ঐতিহ্যকে অনুসরণ ও সংরক্ষণ করেছেন।

আমরা একইসঙ্গে দুটি আবেগে আক্রান্ত হয়েছিলাম। একদিকে আমাদের বাবার মৃত্যুর জন্য কাঁদছিলাম এবং অন্যদিকে আমাদের শেখ আমাদের বাবার জন্য যা করেছেন তাতে সন্তুষ্ট ছিলাম। বাবা যখন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন তখন তিনি তার কল্যাণের জন্য যে মমতা নিয়ে এসেছিলেন তা আমরা কখনওই ভুলব না; এবং এটা নুরের শব্দে লেখা একটি আশীর্বাদময় অলৌকিক কাজ ছিল। মাওলানা শেখ তাঁর পবিত্র হাত দিয়ে বাবাকে গোসল দিয়েছিলেন, কাফন পরিয়েছিলেন এবং তাঁর পবিত্র হাত দিয়ে তাকে কবরে রেখেছিলেন। নিজের কাজগুলো শেষ করে সেদিনই তিনি একটি ফ্লাইটে সাইপ্রাসে ফিরে যান।

কোন ধরণের আবেগ এবং অনুভূতি অন্তরে আসে যখন কারুর চোখের সামনে এমন ঘটনা ঘটে যা স্বাভাবিক মন বুঝতে বা কল্পনাও করতে পারে না? কলম এই সে অনুভূতিগুলি প্রকাশ করতে অক্ষম। আমরা কেবল একটি কথা বলতে পারি: এটি সত্য, এটি ঘটেছিল। এটি এমন একটি বাস্তবতা যা রহস্যময় ঐশী শক্তির মাধ্যমেই সম্ভব, এমন অবিশ্বাস্য ক্ষমতা যখন কেউ পান বুঝতে হবে যে তিনি আল্লাহর কাছ থেকে ঐশী ভালোবাসা পেয়েছেন। সেই ভালবাসার মাধ্যমেই তিনি ঐশী উৎস থেকে জ্ঞান লাভ করবেন, প্রজ্ঞা লাভ করবেন এবং আধ্যাত্মিকতা লাভ করবেন। তাকে সবকিছু দেওয়া হবে। তিনি অতীতের জ্ঞানী, বর্তমানের জ্ঞানী এবং ভবিষ্যতের জ্ঞানী হবেন।

একবার মাওলানা শেখ নাজিম ق হজ মরসুমে দুই মাসের জন্য লেবাননে এসেছিলেন। লেবাননের ত্রিপোলির গভর্নর আশার আদ-দায়া হজের সরকারি কাফেলার প্রধান ছিলেন। তিনি শেখ নাজিমকে তাঁর সাথে হজে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। শেখ বললেন, ‘আমি আপনার সঙ্গে যেতে পারছি না, তবে ইনশাআল্লাহ আমি সেখানে আপনার সঙ্গে দেখা করব।’ গভর্নর জোর অনুরোধ করে বললেন, ‘আপনি যদি যাবেনই, তবে দয়া করে আমার সঙ্গে যান। অন্য কারও সঙ্গে যাবেন না।’ মাওলানা শেখ জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি যাব কি-না আমি এখনও জানিই না।’ শেখ নাজিম ত্রিপোলিতে যে বাড়িতে থাকতেন হজের মরসুম শেষ হয়ে যাওয়ার পরে গভর্নর ফিরে এসে সেখানে পৌঁছে গেলেন। আমরাসহ আরও ১০০ জন লোকের সামনে গভর্নর বললেন, ‘ও শেখ নাজিম, আপনি অন্য কারও সঙ্গে কেন গেলেন, কেন আপনি আমার সাথে আসেন নি?’ আমরা বললাম, ‘মাওলানা শেখ তো হজ্জ্ব করেন নি। দু’মাস ধরে তিনি এখানে আমাদের সঙ্গে রয়েছেন, লেবাননের আশেপাশে ভ্রমণ করছেন।’ গভর্নর বললেন, ‘না! তিনি হজে ছিলেন। আমার সাক্ষী আছে। একদিন আমি কাবা তাওয়াফ করছিলাম, শেখ নাজিম আমার কাছে এসে বললেন, ‘ও আশার, তুমি কি এখানে আছ?’ আমি বললাম, জি শেখ।’ তারপর আমরা একসঙ্গে তাওয়াফ করলাম। আমরা মক্কার একটি হোটেলে একসঙ্গে রাত কাটিয়েছি। তিনি আমাদের সঙ্গে আমাদের তাঁবুতে আরাফাতের দিনটি কাটিয়েছেন। তিনি আমার সঙ্গে মিনায় রাত কাটিয়েছেন, এবং আমাদের সঙ্গে মিনায় তিন দিন অবস্থানও করেছেন। এরপর তিনি আমাকে বললেন, ‘আমাকে নবি ﷺ এর সঙ্গে দেখা করতে মদিনায় যেতে হবে।’

গভর্নর আশার আদ-দায়া যখন এই গল্পটি বলছেন, আমরা শেখ নাজিমকে যত্ন সহকারে পর্যবেক্ষণ করছিলাম, কারণ আমরা জানতাম যে তিনি লেবাননে আমাদের সঙ্গেই ছিলেন আর অন্য কোথাও যান নি। আমরা সেই অনন্য, লুকানো হাসি দেখেছি, যেন তিনি বলতে চেয়েছেন, ‘এটা সেই শক্তি যা আল্লাহ তাঁর আউলিয়াকে দান করেন। যখন আউলিয়া আল্লাহর পথে চলে যায়, যখন তারা তাঁর ঐশী প্রেম এবং উপস্থিতিতে বিলীন অবস্থায় পৌঁছায়, আল্লাহ তাদেরকে সমস্ত কিছু দান করেন।’

গভর্নর আশার আদ-দায়াও এটি লক্ষ করলেন ও বললেন, ‘ও আমার শেখ, আপনি আমাদের যে অলৌকিক ক্ষমতা দেখিয়েছেন, সেটা কী? এটা অবিশ্বাস্য! এটি এমন কিছু যা আমি সারা জীবন কখনও দেখি নি। আমি একজন রাজনীতিবিদ এবং আমি আমার মন আর যুক্তির উপর ভরসা করি। তবুও আমি না বলে পারছি না যে, আপনি কোনও সাধারণ মানুষ নন, আপনার মধ্যে অতিমানবিক শক্তি রয়েছে। এটি অবশ্যই এমন কিছু যা দিয়ে স্বয়ং আল্লাহ সুবহানু ওয়া তা’আলা আপনাকে সজ্জিত করেছেন!’ তিনি মাওলানা শেখের হাতে চুমু খেলেন এবং তাকে নকশবন্দি তরিকায় বায়াহ দিতে অনুরোধ করলেন। যখনই মাওলানা শেখ নাজিম ق লেবানন সফর করতেন, সেই গভর্নর এবং লেবাননের প্রধানমন্ত্রী মাওলানা শেখের সঙ্গে বসে থাকতেন। আজ অবধি তাদের পরিবার এবং লেবাননের অনেক লোকই তাঁর অনুসারী।

 

শেখ নাজিমের বাণী থেকে

অনন্য একত্ববাদ (ওয়াহদানিয়্যাহ্) বিষয়ে তিনি বলেছেন:

“এর অর্থ বহুত্বের অস্তিত্বের অসম্ভবতা এবং এটি তিনটি প্রকারের:

সত্ত্বার অনন্য একতা: এর অর্থ হলো, তাঁর (আল্লাহর) মর্ম দুটি বা ততোধিক অংশ থেকে সংযোজিত বা সংমিশ্রিত হয় নি এবং তাঁর ঐশী অস্তিত্বের অনুরূপ কিছুই নেই।

তাঁর বৈশিষ্ট্যগুলির (সিফাতের) অনন্য একতা: এর অর্থ এই যে, মহান পরাক্রমশালী এবং সর্বোন্নত আল্লাহ, একই বিষয়ের প্রতিনিধিত্বকারী দুটি ধরণের বৈশিষ্ট্য রাখেন না। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর দুটি উইল বা দুটি উদ্দেশ্য নেই। তিনি প্রতিটি গুণাবলীতেই একক।

তাঁর কর্মের অনন্য একতা: এর অর্থ হল এই যে, তিনি এই মহাবিশ্বের সকল কিছুরই সৃষ্টিকর্তা তাঁর নিজের ইচ্ছায় ও তাঁর নিজের শক্তিতে । সমস্ত সৃষ্টি পদার্থ বা বিবরণ বা কোনও ক্রিয়া। এভাবে তাঁর সমস্ত কর্ম তাঁর বান্দাদের জন্যই তৈরি করেছেন।”

“যদি ভালবাসা সত্য হয়, তবে প্রেমিক অবশ্যই প্রেমাস্পদকে শ্রদ্ধা করবে ও তার প্রতি যথাযথ আচরণ করবে।”

“সত্যের সর্বোচ্চ নিশ্চয়তাটি তখনই যখন মুরশিদ তেমার চোখে ঐশী উপস্থিতিকে মহিমান্বিত করেন এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য সমস্তকিছুকেই হ্রাস করে দেন।” 

“তিনটি বড় সাপ মানুষের ক্ষতি করে: চারপাশের লোকদের প্রতি অসহিষ্ণু ও অধৈর্য হয়ে ওঠা; ছেড়ে যেতে পারবে না এমন কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া; এবং নিজের অহং (নফস) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া।

“দুনিয়া অর্জন হলো আত্মঅবমাননাকর এবং পরকাল (আখিরাহ) অর্জন করা সম্মানের। যারা সম্মানের চেয়ে অবমাননা পছন্দ করে তাদের দেখে আমি অবাক হই। ”

“যদি পরম পরাক্রান্ত ও সর্বোন্নত আল্লাহ তার ঐশী প্রেমের সার উন্মুক্ত করতেন, তবে পৃথিবীর সবাই সে প্রেমে মরে যেত।”

“আমাদের অবশ্যই সর্বদা এই বিষয়গুলিতে নিযুক্ত থাকতে হবে: পবিত্র কোরআনে আল্লাহর বাণী ও তাঁর নিদর্শনগুলি বিষয়ে চিন্তা করা যা আমাদের মধ্যে ভালবাসা বিকশিত করবে; আমাদের প্রতিদান দেওয়া বিষয়ে তাঁর প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে ভাবা যা আমাদের মধ্যে ব্যাকুলতা সৃষ্টি করবে ও উৎসাহিত করবে; এবং তাঁর শাস্তি সম্পর্কে করা সতর্কবাণী বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা, যা আমাদের মধ্যে আল্লাহর প্রতি লজ্জা সৃষ্টি করবে।”

“আল্লাহ বলেছেন, ‘যে আমার বিষয়ে ধৈর্য্যশীল, সে আমাকে পাবে।’”

“যদি মনের মধ্যে আল্লাহর ভয় গভীর হয়, জিভ এমন কথা বলবে না  যা উদ্দেশ্যহীন ও অনুচিত।”

“তাসাউফ হলো আল্লাহর ঐশী উপস্থিতিতে অগ্রগতির পবিত্রতা এবং এর মর্মার্থ হচ্ছে এই বস্তুবাদী জীবনকে ত্যাগ করা।”

“একসময় জুনায়েদ বাগদাদী ق ইবলিসকে (শয়তান) একটি দিব্যদর্শনে (ভিশনে) দেখেছিলেন; সে উলঙ্গ ছিল। তিনি তাকে বলেছিলেন, ‘হে অভিশপ্ত, তুমি কি লোককে উলঙ্গ দেখাতে লজ্জা পাচ্ছ না?’ শয়তান বলল, ‘হে জুনায়েদ, লোকেরা যখন নিজের থেকে লজ্জা পায় না তখন আমি কেন লজ্জা পাব?’”

“আপনি যখন আল্লাহর পথের কোন সালেকের (সন্ধানকারী) সঙ্গে সাক্ষাত করেন, তখন আন্তরিকতা ও আনুগত্য নিয়ে এবং শিষ্টাচারের সঙ্গে তাঁর কাছে যান। জ্ঞানের অভিব্যক্তি নিয়ে তাঁর কাছে যাবেন না। জ্ঞান প্রথমে তাকে রাগিয়ে দিতে পারে, তবে বিনয় তাকে তাড়াতাড়ি আপনার কাছে এনে দেবে।”

“একজন সালেক এমন কেউ হবেন যিনি নিজেকে ত্যাগ করে তার হৃদয়কে ঐশী উপস্থিতির সাথে সংযুক্ত করেছেন। তিনি আল্লাহর উপস্থিতিতে দাঁড়িয়ে নিজের করণীয় উপাসনা সম্পন্ন করেন এবং হৃদয় দিয়ে আল্লাহকে দেখতে পান। আল্লাহর নুর তার হৃদয়কে দগ্ধ করে তাতে গোলাপের সুধার তৃষ্ণা জাগিয়ে দেয়, এবং তার চোখের ওপর থেকে পর্দা তুলে দেয়, যাতে তিনি তার প্রভুকে দেখতে পান। তিনি যদি মুখ খোলেন তবে তা ঘটে ঐশী উপস্থিতির আদেশক্রমে। যদি তিনি মুখ নড়ান তা আল্লাহর আদেশে, তিনি যদি প্রশান্ত থাকেন তবে ঐশী গুণাবলীর ক্রিয়াতেই ঘটে। তিনি ঐশী উপস্থিতিতেই বিরাজ করেন এবং আল্লাহর সাথে থাকেন।”

“সুফি হলেন তিনি, যিনি নবি করিম এর দেওয়া বাধ্যবাধকতা পালন করেন এবং নিজেকে পরিপূর্ণ চরিত্রের স্তরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন, যা সর্বশক্তিমান ও পরম পরাক্রান্ত আল্লাহর জ্ঞান।”

“তাসাউফ এক জ্ঞান যা থেকে মানুষ আত্মার অবস্থা বিষয়ে জানতে পারে, তা সেই অবস্থা প্রশংসনীয় অথবা অপ্রশংসনীয় যাইই হোক। যদি এটি প্রশংসার অযোগ্য হয় তবে সে জানতে পারে যে একে কেমন করে শুদ্ধ করা যেতে পারে এবং সক্রিয় করে তোলা যেতে পারে, যেন প্রশংসনীয় হয়ে উঠে সেই আত্মা আল্লাহর ঐশী উপস্থিতির দিকে যাত্রা করতে পারে। এর ফল হচ্ছে আত্মার উন্নতি : সর্বোচ্চ গৌরবের অধিকারী আল্লাহ বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জ্ঞান লাভ করা; পরজগতে পরিত্রাণ লাভ করা; আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করা; চিরকালীন সুখ অর্জন করা; আলোকিত হওয়া ও পরিশুদ্ধ হওয়া যেন মহৎ বিষয়সমূহ নিজেদের উন্মোচিত করে, অসাধারণ অবস্থাসমূহ প্রকাশিত হয়, এবং সে দেখতে পায় যা অন্যে দেখতে পায় না।”

“তাসাউফ বিশেষ ধরণের উপাসনা নয়, বরং আল্লাহর প্রতি অন্তরের সংযুক্তি। এই জাতীয় সংযুক্তির দাবি হলো, যখনই কারও পরিস্থিতিতে পবিত্র বিধানটির মান অনুযায়ী কোনও জিনিসকে তার জন্য পছন্দ (মানদুব) করা হয়, তবে সে তা করে। এ কারণেই আমরা দেখতে পাই যে সুফিরা ব্যাপক বৈচিত্র্যপূর্ণ সামর্থ্যে ইসলামের সেবা করেছেন। ইসলামী পণ্ডিতদের অবশ্যই সুফিবাদের উচ্চতর শিক্ষা অর্জন করতে হবে।”

 

শেখ নাজিম সম্পর্কিত গ্র্যান্ডশেখের ভবিষ্যদ্বাণী

গ্র্যান্ডশেখ আবদুল্লাহ দাগেস্তানি ق তাঁর ইন্তেকালের আগেই নিজে থেকে বলেছিলেন, “নবি করিম এর আদেশে আমি আমার উত্তরসূরি নাজিম এফেন্দিকে প্রশিক্ষিত ও উন্নত করেছি এবং তাকে অনেক খালওয়াতে পাঠিয়েছি, তাকে কঠোর প্রশিক্ষণ দিয়েছি এবং আমি তাকে আমার উত্তরসূরি নিযুক্ত করছি। আমি দেখতে পাচ্ছি যে ভবিষ্যতে তিনি এই তরিকাটি পূর্ব এবং পশ্চিমে ছড়িয়ে দেবেন। আল্লাহ তা’আলা বিংশ শতাব্দির শেষে এবং একবিংশ শতাব্দির শুরুতে, ধনী-দরিদ্র, বিদ্বান ও রাজনীতিবিদসহ সকল ধরণের লোককে তাঁর নিকটে আনবেন, তারা তাঁর কাছ থেকে শিখবেন এবং নকশবন্দি তরিকা গ্রহণ করবেন। এটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে; একটি মহাদেশও এর মিষ্টি ঘ্রাণ থেকে বঞ্চিত হবে না।”

“আমি তাকে লন্ডনে বিশাল সদর দফতর প্রতিষ্ঠা করতে দেখছি যার মাধ্যমে তিনি এই তরিকাটি ইউরোপ, দূরপ্রাচ্য এবং আমেরিকায় ছড়িয়ে দেবেন। তিনি মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা, ভালবাসা, ধার্মিকতা, সম্প্রীতি এবং সুখ ছড়িয়ে দেবেন এবং সকলেই কুরুচি, সন্ত্রাসবাদ এবং নোংরা রাজনীতি ছেড়ে চলে যাবে। তিনি হৃদয়ের মধ্যে শান্তির জ্ঞান, সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তির জ্ঞান, জাতিসমূহের মধ্যে শান্তির জ্ঞান ছড়িয়ে দেবেন, যাতে এই বিশ্ব থেকে যুদ্ধ ও সংগ্রামকে দূরে সরানো যায় এবং শান্তিই হবে প্রধান বিষয়। আমি তরুণদের দেখছি যে সমস্ত জায়গা থেকে তারা তাঁর কাছে ছুটে আসছেন, তার বারাকাহ ও দোয়া চাইছেন। তিনি তাদেরকে ইসলামী রীতিতে তাদের দায়িত্ব পালনের উপায়, মধ্যপন্থী হওয়া, প্রতিটি ধর্মের প্রত্যেকের সাথে শান্তিতে বাস করার, বিদ্বেষ ও শত্রুতা ত্যাগ করার উপায় শেখাবেন। ধর্ম আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহ তার বান্দাদের বিচারক।”

গ্র্যান্ডশেখ আবদুল্লাহ দাগেস্তানি ق যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন বাস্তবে ঠিক তেমনই ঘটেছে। ১৯৭৩ সালে গ্র্যান্ডশেখ আবদুল্লাহ ق মারা যাওয়ার পরে, মাওলানা শেখ নাজিম ق প্রথম তুরস্কে ফিরে বার্সা সফরে এসেছিলেন। তারপরে লন্ডনে চলে গেলেন। অনেক যুবক, বিশেষত জন বেনেটের অনুসারীরা তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। বহু লোক তাঁর কথা শুনতে আসতে শুরু করে এবং ১৯৭৪ সালে তিনি লন্ডনে তার প্রথম সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি ইংল্যান্ড ও ইউরোপ মহাদেশে তার প্রথম সফরের পরে রমজানের সময় এবং তার পরে বার্ষিক সফর করেছিলেন। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে একত্রে সমস্ত ইউরোপে অনুপ্রবেশ করে তরিকাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আধ্যাত্মিকতায় মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য মাওলানা শেখ লন্ডনে তিনটি সেন্টার বা জাওয়াইয়া খোলেন যেন তাদের হতাশা দূর হয় আর অন্তরে প্রশান্তি আসে। তার শিক্ষা ইউরোপের সকল অংশ, উত্তর আফ্রিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, উপসাগরীয় দেশগুলো, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, রাশিয়া, চিনের কিছু অংশ, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।

আমরা যে দেশগুলির নাম নিলাম এবং যে দেশগুলির কথা বললাম না, সেখানেও শেখ নাজিমের ق স্পর্শ অনুভূত হয় না এমন জায়গা আপনি খুঁজে পাবেন না। এ বিষয়টিই এখন যত আউলিয়া বেঁচে আছেন এবং যারা আগে এসেছিলেন তাদের সকলের থেকে তাকে স্বতন্ত্র করে। লক্ষণীয় যে তাঁর উপস্থিতিতে সমস্ত ভাষাতেই লোকে কথা বলে। প্রতিবছর, রমজান মাসে লন্ডনে একটি বিশাল সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সারা বিশ্ব থেকে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ অংশ নেয়। যেমন আল্লাহ বলেছেন, “আমরা তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও উপজাতিতে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরকে জানতে পারো” [কুরআন ৪৯:১৩]। 

মাওলানা শেখ নাজিমের ق অনুসারীরা এসেছেন সর্বস্তরের থেকে। আপনি তাঁর মুেরিদদের মধ্যে গরিব, মধ্যবিত্ত, ধনী, ব্যবসায়ী, ডাক্তার, আইনজীবী, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ, প্লাম্বার, ছুতার, সরকারের মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, সিনেটর, সংসদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, রাজা , সুলতান এবং সকল ধরণের অভিজাতদের পাবেন। প্রত্যেকে তাঁর সরলতা, তার হাসি, তার আলো এবং তাঁর আধ্যাত্মিকতার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। এইভাবে তিনি বহু সংস্কৃতির বৈশ্বিক শেখ হিসেবেই পরিচিত।

মাওলানা শেখ নাজিমের ق বক্তব্য এবং সোহবাহ সংগ্রহ করে অনেকগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে। Mercy Oceans (করুণা সিন্ধু) সিরিজের নাম বলা যায় যার ভলিউম সংখ্যা ৩৫ টিরও বেশি, হাজার হাজার ফুট ভিডিওটেপ এবং কয়েক হাজার ঘন্টা অডিওটেপ। তাঁর জীবন ছিল অসাধারণ সক্রিয়তায় পরিপূর্ণ। তিনি ছিলেন আল্লাহর পথের এক পরিব্রাজক, ঘরে থাকা তার ধরন ছিল না; এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় তিনি অন্তহীন ঘুরে বেড়িয়েছেন। একদিন পুর্বে তো অন্যদিন পশ্চিমে। একদিন উত্তরে তো পরেরদিন গেছেন দক্ষিণে। আপনি জানতে পারবেন না তিনি আজ এখানে আছেন, তো কাল কোথায় থাকবেন।      

মাওলানা শেখ নাজিম ق সবসময় পুনর্মিলন, শান্তি ও প্রকৃতি জগতের সংরক্ষণকে উত্সাহিত করার জন্য অনেক সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি মানবজাতির হৃদয়ে সর্বদা ভালবাসা, শান্তি এবং সম্প্রীতির বীজ বুনে গেছেন। আমরা আশা করি যে তার শিক্ষার চেতনায় সমস্ত ধর্মই পুনর্মিলনের পথ খুঁজে পাবে; শান্তি ও সম্প্রীতি নিয়ে বাস করার জন্য পার্থক্যগুলো উপেক্ষা করতে পারবে।               

বিশ্বের ভবিষ্যত বিষয়ে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীগুলি গ্র্যান্ডশেখ আবদুল্লাহর ق ভবিষ্যদ্বাণীগুলির একটি ধারাবাহিকতা, ঘটনার আগেই ঘটনাগুলি ঘোষণা করা, লোকদের সতর্ক করা এবং যা ঘটতে যাচ্ছে সেদিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তিনি বহুবার বলেছিলেন, “কমিউনিজম ধ্বংস হতে যাচ্ছে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।” তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, “বার্লিনের প্রাচীর ধসে যাবে।”            

নকশবন্দি সুফিধারার গোল্ডেন চেইনের গোপন রহস্য তাঁর হাতে। তিনি এটিকে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে বহন করেন। নকশবন্দি তরিকা এখন সব জায়গাতেই জ্বলজ্বল করছে। আল্লাহ তায়ালা মাওলানাকে আর্শীবাদ করুন এবং তাঁর পবিত্র কাজে তাকে শক্তিশালী করুন। আল্লাহ প্রিয় নবি মুহাম্মাদ , তাঁর পরিবার, তাঁর সাহাবাগণ এবং সমস্ত নবি-আউলিয়া, বিশেষত নকশবন্দী তরিকা ও অন্য সকল সুফিধারায় তাঁর অনুগত বান্দাদের এবং বর্তমান সময়ে তাঁর বন্ধু শেখ নাজিম আল হাক্কানিকে ق প্রভূত কল্যাণ, প্রশান্তি ও নূর দান করুন।

[এই নিবন্ধটি মাওলানা শেখ নাজিমের ق জীবদ্দশায় লিখিত।]